কব্জি (Wrist) খুবই জটিল জয়েন্ট। এটি একটি জয়েন্ট নয়। অনেকগুলো ছোট হাড় ও ছোট ছোট জয়েন্ট মিলে কব্জি তৈরি হয়। হাড়গুলোকে ধরে রাখতে আছে দৃঢ় লিগামেন্ট ও রগ। হাড়ের আকৃতিও এই জয়েন্টকে সুসংহত রাখে। তাই আমরা অনেক ভারী কাজ অনায়াসে করতে পারি।
কোনো কারণে এই হাড়, কার্টিলেজ, রগ বা লিগামেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যথা হয়। কব্জির সঙ্গে কয়েকটি স্নায়ু আছে, সেগুলোতে চাপ পড়লেও কব্জি ও হাতে ব্যথা হতে পারে। সঠিক চিকিৎসার জন্য সঠিক কারণ বের করা খুব জরুরি।
ব্যথা থেকে কী জটিলতা হয়
সঠিক চিকিৎসা না হলে পুরো হাতের কর্মক্ষমতাই নষ্ট হতে পারে। কব্জি অনেকদিন না নাড়ালে নড়াচড়া ধীরে ধীরে কমে যায়।
উদাহরণ: আমরা সাধারণত ডান হাতে খাই। ডান কব্জি ঘোরানো না গেলে থালা থেকে ভাত মুখে তোলা যাবে না। কব্জি ঘোরাতে পারা অত্যন্ত জরুরি। ঠিকমতো না ঘোরালে হাত থাকা না থাকা প্রায় সমান।
ব্যথার কারণ
- হাত ও কব্জির অতিরিক্ত বা ভুল ব্যবহার
- কব্জির চারপাশের রগের প্রদাহ (Tendonitis)। এটি বড় একটি কারণ এবং কোনো কারণ ছাড়াও হতে পারে
- কব্জিতে সরাসরি আঘাত
- কব্জির আশপাশে কোনো স্নায়ুতে চাপ
- সংক্রমণ (Septic arthritis)
- কব্জির হাড় বা অন্য কোষ-কলায় টিউমার
- বাইরের কারণ ছাড়া প্রদাহ: রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, অস্টিওআর্থ্রাইটিস (অনেকদিন ধরে ব্যথা, ধীরে ধীরে বাড়ে)
- অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ
- শরীরের আরও অনেক অসুখ
- ঘাড়ের মেরুদণ্ডের সমস্যা। স্পাইনাল কর্ড থেকে স্নায়ু বেরোনোর ছিদ্র সংকুচিত হলে হাত ব্যথা ও অবশ হয়
- গর্ভাবস্থা
- মেনোপজ
- ওজন অনেক বেড়ে যাওয়া
- কব্জির আশপাশের বার্সা (তরল আঠালো পদার্থে ভরা ছোট থলে)-র প্রদাহ
লক্ষণ
সরাসরি আঘাত পেলে ব্যথা, ফোলা ও আকৃতির বিকৃতি হয়। আঘাত ছাড়াও এসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে:
- কব্জিতে ব্যথা
- কব্জি ফোলা
- ওপরের চামড়া লাল হওয়া
- নাড়াতে গেলে ব্যথা
- বিশ্রামেও ব্যথা
- হাত অবশ লাগা
- হাতে কাঁটা কাঁটা বা ঝিনঝিন ভাব
যেসব পেশায় কব্জির ব্যথা প্রায়ই হয়: বেশিক্ষণ কিবোর্ড ব্যবহার, কিবোর্ড ও মাউস ভুলভাবে ব্যবহার, চুল কাটা, বোনা, সেলাই, গিটার হারমোনিয়াম বেহালা বাজানো, ভারী কাজ (কুলি) ইত্যাদি।
সাধারণ চিকিৎসা
কারণ জেনে চিকিৎসা ঠিক হয়।
সাধারণ আঘাত পেলে
- কব্জি ও হাতকে বিশ্রাম
- সাধারণ ব্যথার ওষুধ
- গরম সেঁক এবং ঠান্ডা চাপ (Cold compression)
- রিস্ট গার্ড (Wrist Guard) ব্যবহার
আঘাত ছাড়া ব্যথা হলে
- হাত ও কব্জির বিশ্রাম
- সাধারণ ব্যথার ওষুধ
- গরম সেঁক
- কব্জির নড়াচড়া বন্ধ রাখতে স্প্লিন্ট (Splint), অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে
- চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
প্রতিরোধ
কখন রিস্ট গার্ড পরবেন
- হাতের অতিরিক্ত কাজ করার সময়
- ভারী জিনিস তোলার সময়
- টেনিস, ব্যাডমিন্টনের মতো খেলায়, যেখানে কব্জি বেশি ব্যবহার হয়
- আগে কব্জিতে আঘাত পেয়ে থাকলে খেলাধুলায় সাবধান থাকুন এবং অবশ্যই রিস্ট গার্ড পরুন
কাজের সময়
- সঠিক ভঙ্গিতে বসুন
- কব্জি শিথিল রাখুন
- হাতের যন্ত্রপাতি ঠিকভাবে ব্যবহার করতে শিখুন
- কম্পিউটারের কিবোর্ড ঠিকভাবে ব্যবহার করুন
- সঠিক মাপের মাউস নিন। ছোট মাউসের চেয়ে একটু বড় আকৃতির মাউস হাত ও কব্জির জন্য ভালো
- কাজের ফাঁকে কব্জিকে বিশ্রাম দিন
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
আঘাত ছাড়া ব্যথা হলে এই লক্ষণ দেখুন:
- হাতে কাজ করতে গেলে কব্জিতে ব্যথা
- বিশ্রামেও ব্যথা
- কব্জি সোজা, বাঁকা বা ঘোরাতে ব্যথা
- ছয় সাত দিনের বেশি ব্যথা
- ব্যথার জন্য দৈনন্দিন কাজ করতে না পারা
- কব্জি ফুলে গেলে
- ব্যথার সঙ্গে জ্বর, কব্জি লাল ও গরম
- হাত বা কব্জিতে ব্যথা, অবশ ভাব ও কাঁটা কাঁটা বোধ
আঘাতের পর: বাইরে থেকে কব্জি বিকৃত দেখালে, ব্যথা ও ফোলা থাকলে, নাড়াতে কষ্ট হলে।
কখন জরুরি চিকিৎসা নেবেন
- হঠাৎ আঘাতের পর কব্জি নাড়াতে না পারা
- কব্জিতে প্রচণ্ড ব্যথা
- কব্জির আকৃতি বিকৃত হয়ে যাওয়া
- কব্জি ও হাত নীল হয়ে যাওয়া বা রং বদলে যাওয়া
- হাত বা আঙুল অবশ হয়ে যাওয়া বা কাঁটা কাঁটা লাগা
এসব থাকলে কারও জন্য বা পরদিন সকালের জন্য অপেক্ষা করবেন না। জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকের কাছে যান।
প্রশ্ন ও উত্তর
কব্জির রগে প্রদাহ (Tendonitis) কেন হয়?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সঠিক কারণ জানা যায় না। সম্ভাব্য কারণ:
- হাত ও কব্জির অতিরিক্ত বা ভুল ব্যবহার
- কব্জিতে বড় আঘাত
- অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ (রক্ত চলাচলে বাধার কারণে)
- রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস
- বয়স বাড়া
রগে প্রদাহ হলে কী লক্ষণ থাকে?
কব্জিতে ব্যথা, নাড়াতে শক্ত লাগা (সকালে ঘুম থেকে উঠে বেশি), চাপ দিলে ব্যথা বাড়া, ফোলা, গরম হওয়া। ব্যথা কব্জিতে বা কনুই থেকে আঙুল পর্যন্ত যে কোথাও থাকতে পারে।
কব্জির আশপাশে স্নায়ুতে চাপ আছে কি না, কীভাবে বুঝব?
কয়েকটি আঙুলে অবশ ভাব থাকবে। সাধারণত প্রথমে বুড়ো আঙুল, তর্জনী ও মধ্যমায়। কব্জি ও তালুতে অস্বস্তি থাকে, হাতে কাঁটা কাঁটা ভাব ও ব্যথা থাকে। ব্যথায় রাতে ঘুম ভেঙে যায়। হাতে বারবার ঝাঁকুনি দিলে একটু আরাম লাগতে পারে।
প্রদাহ হলে মালিশ করা যাবে কি?
আগে দেখতে হবে আশপাশের কোষ-কলায় সংক্রমণ আছে কি না। সংক্রমণ থাকলে মালিশ করবেন না। বাইরের কোনো কারণ ছাড়া প্রদাহ হলে মালিশ উপকারী। চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কীভাবে মালিশ করব?
নিজে করা যায়। আঙুল রগের সঙ্গে সমকোণে রেখে আস্তে চাপ দিয়ে নাড়ান। চিকিৎসকের কাছে শিখে নিতে পারেন।
সেঁক দেব কি?
সংক্রমণের কারণে ব্যথা হলে সেঁক দেবেন না। বাইরের কারণ ছাড়া প্রদাহ হলে অনেক সময় উপকারী। চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে নিন। সেঁকে রক্ত চলাচল বাড়ে, মাংসপেশি শিথিল হয়, ব্যথা কমে।
রগ টান টান করার ব্যায়াম করব কি?
অনেক সময় বেশ উপকারী। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে করুন।
রগের প্রদাহ কি বিপজ্জনক হতে পারে?
হ্যাঁ। দীর্ঘদিন প্রদাহ থেকে সঠিক চিকিৎসা না নিলে রগ আপনা আপনি ছিঁড়ে যেতে পারে (Tendon Rupture)।
বার্সার প্রদাহ কি বড় ক্ষতি করতে পারে?
হ্যাঁ। দীর্ঘদিন থেকে সঠিক চিকিৎসা না হলে বার্সার দেয়ালে ক্যালসিয়াম লবণ জমতে পারে (Calcific Bursitis)। তাতে স্থায়ীভাবে কব্জির নড়াচড়া কমে যেতে পারে, এমনকি কব্জি শক্ত হয়ে নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। কব্জির ব্যথা ছয় সাত দিনের বেশি থাকলে বা ওপরের সতর্ক লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের কাছে যান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কব্জির আশপাশে স্নায়ুতে চাপ পড়লে কী কী লক্ষণ দেখা যায়?
সাধারণত প্রথমে বুড়ো আঙুল, তর্জনী ও মধ্যমায় অবশ ভাব দেখা দেয় এবং কব্জি ও তালুতে অস্বস্তি বা কাঁটা কাঁটা অনুভূতি থাকে। রাতে ব্যথায় ঘুম ভেঙে যেতে পারে এবং হাতে বারবার ঝাঁকুনি দিলে কিছুটা আরাম লাগে।
কম্পিউটার ব্যবহার বা কাজের সময় কব্জির ব্যথা এড়াতে কী করা উচিত?
সঠিক ভঙ্গিতে বসে কব্জি শিথিল রেখে কিবোর্ড ব্যবহার করতে হবে এবং কাজের ফাঁকে কব্জিকে বিশ্রাম দিতে হবে। ছোট মাউসের চেয়ে একটু বড় আকৃতির মাউস ব্যবহার করা হাত ও কব্জির জন্য ভালো।
কব্জিতে প্রদাহ বা ব্যথা হলে কি সবসময় মালিশ ও গরম সেঁক দেওয়া যায়?
না, কব্জির আশপাশের কোষ-কলায় সংক্রমণ থাকলে মালিশ করা বা সেঁক দেওয়া যাবে না। তবে বাইরের কোনো কারণ ছাড়া প্রদাহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে মালিশ ও সেঁক দিলে রক্ত চলাচল বাড়ে এবং ব্যথা কমে।
এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।