হাত ও পা

কনুইয়ের ব্যথা: কারণ, টেনিস এলবো ও করণীয়

কনুই আমাদের শরীরের অন্যতম জটিল জয়েন্ট। তিনটি হাড় এমনভাবে মিলে কনুই তৈরি করে যে, সুস্থ থাকলে আমরা এর কথা ভুলেই থাকি। ব্যথা শুরু হলেই প্রথম টের পাই, এখানে একটা জয়েন্ট আছে। আর এই জয়েন্টের সামান্য সমস্যাতেও পুরো হাতের কাজের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

কনুইয়ে ব্যথা কেমন হয়

কনুইয়ের ব্যথা খুব সাধারণ। যাঁরা ডান হাতে কাজ করেন, তাঁদের ডান কনুইয়ে বেশি হয়, তবে বাম কনুইয়েও হতে পারে। সঙ্গে থাকতে পারে:

  • কনুই ফুলে যাওয়া
  • চামড়া লাল হওয়া
  • সামান্য ওজন তুলতেও কষ্ট হওয়া
  • ব্যথা কাঁধ পর্যন্ত উঠে যাওয়া, কখনো কব্জি ও আঙুল পর্যন্ত নেমে আসা
  • কিছু মোচড়াতে গেলে ব্যথা, যেমন ভেজা কাপড় নিংড়ানো

বড় কোনো আঘাত ছাড়াই বেশিরভাগ রোগী কনুইয়ের ব্যথা নিয়ে আসেন।

ব্যথার কারণ

  • হাতের অতিরিক্ত ব্যবহার, যেমন কলকারখানার শ্রমিকদের। এতে কনুইয়ের আশপাশের রগে প্রদাহ (টেন্ডনাইটিস) হয়।
  • বারবার ভারী জিনিস তোলা, যেমন গুদামের কাজে।
  • জোর করে কিছু মোচড়ানো, যাতে রগ আংশিক ছিঁড়ে যেতে পারে।
  • টেনিস, ব্যাডমিন্টনের মতো কিছু খেলা।
  • কোনো কারণ ছাড়াই কনুইয়ের আর্থ্রাইটিস।
  • কনুইয়ে সরাসরি আঘাত বা মচকে যাওয়া।
  • কনুইয়ের হাড়ে ইনফেকশন বা জয়েন্টে ইনফেকশন।
  • আশপাশের স্নায়ুতে চাপ পড়া।
  • হাড় ফেটে যাওয়া বা ভেঙে যাওয়া।
  • কনুইয়ের হাড় বা অন্য টিস্যুতে টিউমার।
  • অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, যাতে প্রায়ই ব্যথা হতে পারে।

টেনিস এলবো কী

কনুইয়ের বাইরের দিকে হাড়ের একটি ছোট উঁচু অংশ থাকে। এর আশপাশের রগে প্রদাহ হলে যে ব্যথা হয়, তাকে বলে টেনিস এলবো (Tennis Elbow)। লক্ষণগুলো:

  • ব্যথা ওপরে বাহু আর নিচে কব্জি পর্যন্ত ছড়াতে পারে
  • আক্রান্ত হাতে জোর লাগে এমন কাজ করতে গেলেই ব্যথা
  • কখনো প্রচণ্ড ব্যথা, সাধারণ জিনিস তুলতেও কষ্ট
  • হাত সোজা করলে বা কনুই টান টান করলে তীব্র ব্যথা

মালিশ করা যাবে? শুরুর দিকে মালিশে কিছু উপকার পাওয়া যায়। এতে ওই জায়গায় রক্ত চলাচল বাড়ে, ক্ষতিগ্রস্ত রগের কিছু অংশ মেরামত হতে পারে এবং ব্যথা কমে।

করণীয়: নিচের উপদেশগুলো মানলে ৬ মাস থেকে এক বছরের মধ্যে অনেক উন্নতি দেখা যায়।

  • কনুইকে বিশ্রাম দিন
  • সঠিকভাবে ব্রেস ব্যবহার করুন
  • কিছু ব্যায়াম অভ্যাস করুন
  • সাধারণ ব্যথার ওষুধ খান
  • ব্যথা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন

ব্রেস কি কাজ করে? হ্যাঁ। ব্রেস সংশ্লিষ্ট মাংসপেশিকে বিশ্রাম দেয়, ফলে ব্যথা কিছুটা কমে।

গরম সেঁক দেওয়া যাবে? হ্যাঁ। গরম সেঁকে রক্ত চলাচল বাড়ে, মাংসপেশি শিথিল হয়, ব্যথা কমে। তবে নিয়মটা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন। গরম ব্যাগ সরাসরি চামড়ায় লাগাবেন না।

চিকিৎসা না নিলে কী হয়? ব্যথা স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। অনেক দিন প্রদাহ থাকলে রগ দুর্বল হয় এবং কখনো হঠাৎ ছিঁড়েও যেতে পারে। এতে কনুইয়ের নড়াচড়া ও হাতের কাজের শক্তি কমে যায়।

কনুইয়ে ইনফেকশন হলে কীভাবে বুঝবেন

  • শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়
  • সাধারণত আগে কোনো আঘাতের ঘটনা থাকে না
  • কনুই ফুলে যায়, ওপরের চামড়া লাল হতে পারে
  • কনুই গরম থাকে
  • জ্বর থাকতে পারে
  • নড়াচড়ায় ব্যথা বাড়ে

এটা কি মারাত্মক? হ্যাঁ। ঠিকমতো চিকিৎসা না হলে কনুইয়ের নড়াচড়া ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে, এমনকি একেবারে বন্ধও হয়ে যেতে পারে। তখন হাতের কাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ব্যথা কমানোর সহজ উপায়

  • কনুইকে বিশ্রামে রাখতে এলবো ব্যাগ বা ব্রেস ব্যবহার করুন
  • সাধারণ ব্যথার ওষুধ খান
  • কনুই ফুলে গেলে বাহু উঁচু করে রাখুন
  • চিকিৎসকের পরামর্শে ঠান্ডা বা গরম সেঁক নিন

কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন

সাধারণ চিকিৎসায় সাত থেকে দশ দিনেও ব্যথা না কমলে, বিশেষ করে এই অবস্থাগুলোতে:

  • প্রতিদিনের সাধারণ জিনিসপত্রও হাতে তুলতে না পারলে
  • বিশ্রামের পরও ব্যথা না কমলে
  • কনুই সোজা বা ভাঁজ করতে না পারলে
  • আঘাত লেগে কনুইয়ের আকৃতি বদলে গেলে
  • হাড় স্থানচ্যুত হলে
  • ব্যথার সঙ্গে চামড়া লাল হলে
  • ব্যথার সঙ্গে জ্বর এবং কনুই ফুলে গেলে

দেরি করলে যে জটিলতা হতে পারে

  • হাতে স্বাভাবিক কাজ করতে না পারা
  • কনুইয়ের নড়াচড়া ধীরে ধীরে স্থায়ীভাবে কমে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া
  • কব্জি ও হাতের কাজের স্বাভাবিক নড়াচড়া স্থায়ীভাবে কমে যাওয়া

এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। ব্যথা না কমলে বা ওপরের কোনো সতর্ক লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের কাছে যান।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

টেনিস এলবো কী এবং এর লক্ষণগুলো কেমন হয়?

কনুইয়ের বাইরের দিকে হাড়ের ছোট উঁচু অংশের আশপাশের রগে প্রদাহ হলে যে ব্যথা হয়, তাকে টেনিস এলবো বলে। এতে ব্যথা ওপরে বাহু এবং নিচে কব্জি পর্যন্ত ছড়াতে পারে এবং হাত সোজা করতে বা সাধারণ জিনিস তুলতেও প্রচণ্ড কষ্ট হয়।

টেনিস এলবোর ব্যথা কমাতে কী করণীয়?

কনুইকে বিশ্রাম দেওয়া, সঠিকভাবে ব্রেস ব্যবহার করা, কিছু ব্যায়াম অভ্যাস করা এবং সাধারণ ব্যথার ওষুধ খাওয়া উপকারী। এছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শমতো গরম সেঁক ও শুরুর দিকে হালকা মালিশে রক্ত চলাচল বেড়ে ব্যথা কমে, তবে সরাসরি চামড়ায় গরম ব্যাগ লাগানো যাবে না।

কনুইয়ের ব্যথায় কখন দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাবেন?

সাধারণ চিকিৎসায় সাত থেকে দশ দিনেও ব্যথা না কমলে, প্রতিদিনের সাধারণ জিনিস হাতে তুলতে না পারলে অথবা কনুই সোজা বা ভাঁজ করতে না পারলে ডাক্তার দেখাতে হবে। এছাড়া আঘাতে কনুইয়ের আকৃতি বদলে গেলে কিংবা ব্যথার সঙ্গে জ্বর, ফোলা ও চামড়া লাল হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান।

এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

আরও পড়ুন

সব প্রবন্ধ
হাত ও পাBurning Hands and Feet

হাত পা জ্বালা করা: কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার

হাত ও পা জ্বালা করার প্রধান কারণ পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি ও ভিটামিন বি কমপ্লেক্সের অভাব। সুষম খাবার ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রেখে এই অস্বস্তি কমানো সম্ভব।

পড়ুন · ২ মিনিট
হাত ও পাFoot Pain

পায়ের পাতায় ব্যথা: কারণ, প্রতিকার ও প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস

পায়ের পাতায় ব্যথা হলে স্বাভাবিক হাঁটাচলা কঠিন হয়ে পড়ে। প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস, পায়ের তলার ব্যথার কারণ, সহজ ব্যায়াম ও ঘরোয়া প্রতিকার জানুন।

পড়ুন · ৬ মিনিট
হাত ও পাGreat Toe Pain

পায়ের বুড়ো আঙুলে ব্যথা: বানিয়ন, আর্থ্রাইটিস ও টার্ফ টো

হাঁটার সময় শরীরের প্রায় অর্ধেক ওজন বহন করে পায়ের বুড়ো আঙুল। বানিয়ন, আর্থ্রাইটিস বা আঘাতে এই আঙুলে ব্যথা হলে কী করবেন এবং কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন জানুন।

পড়ুন · ৩ মিনিট