আমাদের শরীর আসলে একটা টলমলে কাঠামো। অন্য কোনো বস্তু দিয়ে এমন শরীর বানিয়ে দাঁড় করালে সেটা যে কোনো দিকে পড়ে যাবে। চার পায়ের বা তিন পায়ের প্রাণী, যেমন লেজ ভর করা ক্যাঙ্গারু, সহজেই দাঁড়াতে পারে। আমরা পারি, কারণ যতক্ষণ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, ততক্ষণ পা ও পায়ের পাতার মাংসপেশি আর মস্তিষ্ক একসঙ্গে সারাক্ষণ কাজ করে।
শেষ পর্যন্ত পায়ের পাতাই আমাদের শরীরের ভার বহন করে, ভারসাম্য রাখে আর সমস্ত ওজন মাটিতে পৌঁছে দেয়। আমরা দাঁড়াই, হাঁটি, খেলি, সবই পায়ের পাতার ওপর ভর করে। তাই পায়ের পাতায় ব্যথা হলে আমরা প্রায় জড়বস্তুর মতো হয়ে যাই।
পায়ের পাতার গঠন
পুরো শরীরের হাড়ের প্রায় এক চতুর্থাংশ থাকে পায়ে। প্রতিটি পায়ে আছে:
- ২৮টি হাড়
- প্রায় ৩০টি জয়েন্ট
- ১০০টির বেশি মাংসপেশি, রগ ও লিগামেন্ট
- রক্তনালী ও কয়েকটি বড় স্নায়ু
জয়েন্ট: প্রায় সব জয়েন্টই সাইনোভিয়াল জয়েন্ট, অর্থাৎ খুব পাতলা এক আবরণে ঢাকা। এই আবরণ প্রায়ই প্রদাহ বা সংক্রমণে আক্রান্ত হয়।
মাংসপেশি: পায়ের আকৃতি দেওয়া ও ঠিকমতো কাজ করার জন্য প্রায় ২০টি মাংসপেশি আছে।
প্ল্যান্টার ফ্যাসিয়া (Plantar Fascia): পায়ের তলার দিকে থাকা একটি শক্ত, জরুরি টিস্যু। এটি পায়ের আকার ধরে রাখে, যাতে শরীরের ওজন চারদিকে ছড়িয়ে যায়, এক জায়গায় চাপ না পড়ে, আর হাঁটার সময় ঝাঁকুনি না লাগে।
পায়ের তলার চামড়া: বিশেষ গঠনের পুরু ও বহুস্তরের চামড়া, যা পা এবং সেই সঙ্গে পুরো শরীরকে সুরক্ষিত রাখে।
রগ ও লিগামেন্ট: পায়ের তলার ধনুকের মতো বাঁকা খিলান (Arch) ধরে রাখে এবং ওজন সমানভাবে ভাগ করে দেয়।
ব্যথার কারণ
- পায়ের অতিরিক্ত ব্যবহার, দীর্ঘদিন উঁচুনিচু জায়গায় হাঁটা
- পায়ের তলার প্ল্যান্টার ফ্যাসিয়ার প্রদাহ
- পায়ের তলার কোনো স্নায়ুতে চাপ পড়া, ফলে পায়ের তলা অবশ লাগা, ব্যথা ও কাঁটা কাঁটা অনুভূতি
- অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে ঝুঁকি অনেক বাড়ে
- টাইট জুতা বা ভুল মাপের জুতা, যা প্রায়ই দেখা যায়
- জুতার শক্ত সোল
- রগ ও লিগামেন্টের প্রদাহ (টেন্ডিনাইটিস)
- পায়ের জয়েন্টের আর্থ্রাইটিস, যেমন ইনফেকশনজনিত, অস্টিওআর্থ্রাইটিস ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস
- ইনফেকশন ও পায়ের তলায় পুঁজ জমা
- পায়ের তলায় কড়া (Corn)
- আঘাত, হাড় ভাঙা, মাংস থেঁতলে যাওয়া, জয়েন্ট স্থানচ্যুত হওয়া
- মেরুদণ্ড ও মস্তিষ্কের অনেক রোগেও পায়ে ব্যথা হতে পারে। সঙ্গে মাথাব্যথা, কোমর বা মেরুদণ্ডে ব্যথা, পা অবশ লাগা কিংবা কাঁটা কাঁটা অনুভূতি থাকতে পারে
ব্যথার সঙ্গে যেসব লক্ষণ দেখা যেতে পারে
- হাঁটতে না পারা বা কষ্ট করে হাঁটা
- পা ফুলে যাওয়া, আকার বদলে যাওয়া
- অতিরিক্ত ব্যথা
- চামড়া ফোলা ফোলা হওয়া, রং বদলে যাওয়া, লাল বা ফ্যাকাশে হওয়া
- পা গরম হওয়া, টিপ দিলে ব্যথা বাড়া
- পায়ের আঙুল নাড়াতে ব্যথা
- পায়ে পানি জমা
- জ্বর
- নখের কোনা মাংসে বসে যাওয়া
- মাথা ও কোমরে ব্যথা
ঘরে প্রাথমিক যত্ন
- পা বিশ্রামে রাখুন
- আরামদায়ক জুতা পরুন, উঁচু হিল এড়িয়ে চলুন
- আঘাতের কারণে ব্যথা হলে আইস প্যাক দিতে পারেন
- সাধারণ ব্যথার ওষুধ খান
- দুটো বালিশের ওপর পা উঁচু করে রেখে বিশ্রাম নিন
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
- প্রাথমিক যত্নের পরও ব্যথা না কমলে
- প্রচণ্ড ব্যথা হলে, বা হঠাৎ ব্যথা বেড়ে গেলে
- ব্যথার সঙ্গে জ্বর থাকলে
- ইনফেকশনের সন্দেহ হলে
- অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের সঙ্গে পায়ে ব্যথা থাকলে
- আঘাতের সঙ্গে প্রচণ্ড ব্যথা হলে, নিজেকে অসুস্থ লাগলে
- পা ফুলে গেলে বা লাল হলে, ফোসকা পড়লে
- পায়ের আকার বদলে গেছে মনে হলে, কিংবা পায়ের চামড়া নষ্ট হলে
পায়ে ব্যথার সঙ্গে যদি মাথা বা কোমরে ব্যথা থাকে, পা অবশ লাগে বা দুর্বল মনে হয়, অবিলম্বে চিকিৎসকের কাছে যান। এগুলো অনেক সময় গুরুতর রোগের লক্ষণ।
প্রশ্ন ও উত্তর
রাতে পায়ের তলায় ব্যথা বাড়ে কেন?
পায়ের তলার টিস্যুর প্রদাহের ব্যথা হাঁটাহাঁটিতে বাড়ে আর রাতে বিশ্রামে কিছুটা কমে। তবে পায়ের তলার কোনো স্নায়ুতে চাপ থাকলে রাতে বিশ্রাম বা ঘুমের সময়ই ব্যথা বাড়তে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সকালে ঘুম থেকে উঠে মেঝেতে প্রথম পা রাখতেই প্রচণ্ড ব্যথা হয়। কেন?
এটি প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিসের (Plantar Fasciitis) ব্যথা। এই লক্ষণ দেখেই মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায় যে আপনি এ রোগে ভুগছেন। চিকিৎসকের কাছ থেকে সঠিক চিকিৎসা নিন।
প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিসে হাঁটাহাঁটি কি উপকারী?
এটি খুব জরুরি প্রশ্ন, কারণ হাঁটলে ব্যথা হয়, আবার কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর হাঁটা শুরু করলেও হয়। সবদিক বিবেচনায় হাঁটাই বেশি উপকারী, এবং এই ব্যথার জন্য হাঁটা সবচেয়ে ভালো ব্যায়াম। তবে হাঁটার আগে পায়ের মাংসপেশি টান টান করার ব্যায়াম (স্ট্রেচিং) ৫ থেকে ৭ মিনিট করে নিতে হবে। এটি চিকিৎসকের কাছ থেকে শিখে নিন।
গরম বা ঠান্ডা সেঁক দেওয়া যাবে?
হ্যাঁ, চিকিৎসকের পরামর্শে। সংক্রমণ থাকলে সেঁক দেবেন না। সংক্রমণ ছাড়া খুব ব্যথা থাকলে ঠান্ডা সেঁক, অল্প ব্যথায় মৃদু গরম সেঁক দিতে পারেন। হিটিং প্যাডও চিকিৎসকের পরামর্শমতো ব্যবহার করুন।
ডায়াবেটিস ও পায়ের পাতার ব্যথা
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রিত হোক বা অনিয়ন্ত্রিত, পায়ের পাতায় ব্যথা হতে পারে। ডায়াবেটিসে পায়ের স্নায়ু সবার আগে এবং মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় (Peripheral Neuropathy)। এর ফলে ব্যথার সঙ্গে আরও লক্ষণ দেখা দিতে পারে:
- পায়ে জ্বালাপোড়া
- পায়ের পাতা অবশ লাগা
- পায়ের তলায় কাঁটা কাঁটা অনুভূতি
- হাঁটার সময় দুর্বল লাগা
- ছুরি বেঁধার মতো ব্যথা
এই লক্ষণগুলো দিনরাত সবসময়ই থাকতে পারে।
কী করবেন
- ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন
- ওজন স্বাভাবিক রাখুন
- উচ্চ রক্তচাপ থাকলে তা-ও নিয়ন্ত্রণে রাখুন
- হাঁটুন। এতে পায়ের মাংসপেশি শক্ত হয় এবং স্নায়ু ভালো থাকে
- চিকিৎসকের পরামর্শে পায়ের স্ট্রেচিং ব্যায়াম করুন
- নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
ডায়াবেটিসের কিছু লক্ষণ, যা চিনে রাখা ভালো
- প্রচণ্ড পিপাসা, প্রচুর পানি খেয়েও না মেটা
- প্রচণ্ড খিদে, খেয়েও না মেটা
- বারবার প্রস্রাব, প্রস্রাবে সংক্রমণ
- প্রচুর খেয়েও ওজন কমে যাওয়া
- দুর্বলতা ও ক্লান্তি
- চোখে ঝাপসা দেখা
- প্রায়ই মাথাব্যথা
দীর্ঘদিনের পায়ের ব্যথায় কিছু সাধারণ পরামর্শ
- সঠিক মাপের, আরামদায়ক, নরম জুতা পরুন
- উঁচু হিল এবং পায়ের সামনের দিকে চাপ দেয় এমন জুতা এড়িয়ে চলুন
- ওজন স্বাভাবিক রাখুন
- চিকিৎসকের পরামর্শে পায়ের মাংসপেশি, লিগামেন্ট ও রগের ব্যায়াম করুন। টেনিস বলের ওপর পা রেখে গড়িয়ে দেওয়া একটি খুব ভালো ব্যায়াম
- ঘরেও খালি পায়ে হাঁটবেন না, কার্পেটের ওপরও নয়। নরম চপ্পল পরুন
- পায়ের তলা এবং আঙুলের ফাঁক পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন
- ব্যথা না কমলে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন
প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস কি পুরোপুরি সারে?
হ্যাঁ, নিয়ম মানলে পুরোপুরি সারতে পারে:
- ওজন স্বাভাবিক রাখুন
- উঁচু হিলের জুতা বাদ দিন
- পায়ের গঠনে কোনো বিকৃতি থাকলে উপযুক্ত জুতা পরুন
- পায়ের মাংসপেশি টান টান করার ব্যায়াম অভ্যাস করুন
- পুরোনো, বেঢপ হয়ে যাওয়া জুতা ফেলে দিন
- ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
- চিকিৎসকের পরামর্শ ঠিকভাবে মানুন
ব্যথার সময় কি ব্যায়াম করা যাবে? ব্যথা সহ্যের মধ্যে থাকলে হ্যাঁ। একটি সহজ ব্যায়াম:
- চেয়ারে সোজা হয়ে বসুন, দুই পায়ের পাতা মেঝেতে সমান্তরালে রাখুন।
- যে পায়ে ব্যথা, সেটি অন্য উরুর ওপর তুলে রাখুন।
- পায়ের আঙুলগুলো গোড়ালির দিকে চেপে ধরুন এবং দশ সেকেন্ড ধরে রাখুন।
- ধরে রাখার সময় পায়ের তলায় চাপ দিয়ে মালিশ করুন।
- প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর ১০ বার করুন।
আরও ভালোভাবে বুঝে নিতে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
এটি কি আপনা থেকে ভালো হতে পারে? হ্যাঁ, তবে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, বাড়তি ওজন ও পায়ের বিকৃতি থাকলে নয়। আর ঠেকানোর নিয়মগুলো ঠিকমতো মানতে হবে।
ব্যথা যেভাবে ঠেকাবেন
- ওজন স্বাভাবিক রাখুন
- ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
- সঠিক মাপের নরম জুতা বা চপ্পল পরুন
- কখনো খালি পায়ে হাঁটবেন না
- পায়ের আকারে বিকৃতি থাকলে সঠিক জুতা বা চিকিৎসা নিন
- মেরুদণ্ডে বিকৃতি থাকলে যথাযথ ব্যবস্থা নিন
- প্রতিদিন কিছু না কিছু হাঁটুন
- পুরোনো ও বিকৃত জুতা ব্যবহার করবেন না
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। ব্যথা না কমলে বা ওপরের কোনো সতর্ক লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সকালে ঘুম থেকে উঠে মেঝেতে প্রথম পা রাখতেই প্রচণ্ড ব্যথা হয় কেন?
সকালে ঘুম থেকে উঠে মেঝেতে প্রথম পা রাখার সময় প্রচণ্ড ব্যথা হওয়া প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিসের প্রধান লক্ষণ। পায়ের তলার শক্ত প্ল্যান্টার ফ্যাসিয়া টিস্যুতে প্রদাহ হলে এই সমস্যা দেখা দেয় এবং এর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে সঠিক চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিসে হাঁটাহাঁটি করা কি উপকারী?
হ্যাঁ, প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিসের ব্যথার জন্য হাঁটাই সবচেয়ে ভালো ব্যায়াম। তবে হাঁটা শুরু করার আগে চিকিৎসকের শেখানো নিয়মে ৫ থেকে ৭ মিনিট পায়ের মাংসপেশি টান টান করার ব্যায়াম (স্ট্রেচিং) করে নিতে হবে।
প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস কি পুরোপুরি ভালো হতে পারে?
হ্যাঁ, সঠিক নিয়ম মেনে চললে প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস পুরোপুরি সারতে পারে। এজন্য ওজন স্বাভাবিক রাখা, উঁচু হিল ও পুরোনো বেঢপ জুতা বাদ দিয়ে আরামদায়ক নরম জুতা পরা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নিয়মিত স্ট্রেচিং ব্যায়াম করা জরুরি।
এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।