বাহুর ওপরের দিকের জয়েন্টকে কাঁধের জয়েন্ট বলে। কাঁধের জয়েন্ট থেকে ঘাড় পর্যন্ত জায়গাটিকে কাঁধ বলে। আমরা কাঁধেই ওজন বহন করি, ব্যাগ ঝোলাই। তাই নানা কারণে এখানে ব্যথা হতে পারে।
কিছু ব্যথা কাঁধের নিজের সমস্যায় হয়। আবার কিছু ব্যথা কাঁধে অনুভূত হয়, কিন্তু উৎপত্তি শরীরের অন্য কোনো অঙ্গে। একে স্থানান্তরিত ব্যথা (Referred Pain) বলে।
স্থানান্তরিত ব্যথার কারণ
- হার্ট: হার্ট অ্যাটাকের ব্যথা বুক, পিঠ, ঘাড়, কাঁধ, চোয়াল ও বাম বাহুতে অনুভূত হতে পারে
- ঘাড়ের ব্যথা: প্রায়ই কাঁধে অনুভূত হয়
- পিত্তথলি: সাধারণত ডান কাঁধে
- অগ্ন্যাশয়: কাঁধে ও পিঠে
- শ্বাসযন্ত্র: ফুসফুসের ক্যান্সার ও নিউমোনিয়ার ব্যথা কাঁধে আসতে পারে
- ডিম্বাশয়ের টিউমার বা অস্বাভাবিক স্থানে গর্ভধারণ (Ectopic pregnancy)-ও কাঁধে ব্যথা দিতে পারে
- যকৃৎ: লিভারের অনেক অসুখের ব্যথা ডান কাঁধে আসে
কখন স্থানান্তরিত ব্যথা সন্দেহ করবেন
কাঁধের জয়েন্ট নাড়াতে ব্যথা নেই, অথচ কাঁধে ব্যথা এবং সঙ্গে এসব লক্ষণ:
- বুকে ব্যথা
- শ্বাসকষ্ট
- নাড়ির গতি অস্বাভাবিক বা অনিয়মিত
- হঠাৎ কথা বলতে কষ্ট
- মাথা হঠাৎ হালকা লাগা
- পায়ে ব্যথা
- কাশির সঙ্গে রক্ত
- জ্বর
- হঠাৎ দেখায় সমস্যা
- হাত বা পায়ের শক্তি কমে যাওয়া
- হঠাৎ অতিরিক্ত ঘাম
- জ্ঞান হারানো
জরুরি: ওপরের যে কোনো অবস্থায় সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যান। এখানে ঘণ্টা নয়, মিনিট হিসাব করতে হয়। কারও জন্য অপেক্ষা করবেন না, সকাল হওয়ার জন্য ঘরে বসে থাকবেন না।
কাঁধের জয়েন্ট সম্পর্কে কিছু কথা
কাঁধের জয়েন্ট শরীরের সবচেয়ে সচল জয়েন্টগুলোর একটি। ওপরে নিচে, সামনে পেছনে ও চক্রাকারে সব দিকে ঘুরতে পারে। পিঠ চুলকানো থেকে চুল আঁচড়ানো, সবকিছুর জন্য সুস্থ কাঁধ দরকার।
এই বিপুল নড়াচড়ার ক্ষমতা আসে রোটেটর কাফ (Rotator Cuff) থেকে, যা চারটি রগ (Tendon) দিয়ে তৈরি। এটি সহজেই নানাভাবে আক্রান্ত হতে পারে। আসলে কাঁধে দুটি জয়েন্ট আছে, একটি মূল এবং সঙ্গে একটি ছোট। এদের গঠনে তিনটি হাড়, মাংসপেশি, অনেক লিগামেন্ট ও রগ থাকে, সঙ্গে রক্তনালী ও স্নায়ু। এর যে কোনোটির সামান্য সমস্যাতেই জয়েন্টের কাজ কমে বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
ঘাড়ের ব্যথাকে অনেক সময় কাঁধের জয়েন্টের ব্যথা মনে হয়, আলাদা করা কঠিন। তাই চিকিৎসককে মনোযোগ দিয়ে শুনতে ও পরীক্ষা করতে হয়, কারণ দুটোর চিকিৎসা সম্পূর্ণ আলাদা। কনুইয়ের আশপাশের ব্যথাও কাঁধের ব্যথা মনে হতে পারে। বয়স বাড়লে এসব ব্যথার সম্ভাবনা বাড়ে।
একটা ভালো কথা: কাঁধের জয়েন্টের ব্যথা বেশিরভাগ সময় সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়। একটু সময় লাগতে পারে, তাই চিকিৎসা চালিয়ে যান, হঠাৎ হতাশ হবেন না।
কাঁধের মূল জয়েন্টের ব্যথার কারণ
- জয়েন্টের আশপাশের টিস্যুর সমস্যা। এটিই সবচেয়ে বেশি
- মচকানো (Strain বা Sprain)
- অতিরিক্ত বা জোর করে জয়েন্ট নাড়ানো
- বাইরের কারণ ছাড়া প্রদাহ, যেমন রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস
- আঘাতের পর হাড় ভাঙা বা জয়েন্ট সরে যাওয়া (Dislocation)
- অস্টিওআর্থ্রাইটিস
- জয়েন্টে সংক্রমণ (Septic arthritis)
- অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ
আশপাশের টিস্যুর কারণে কীভাবে ব্যথা হয়: ভারী ওজন বহন বা সীমার বাইরে জোর করে নড়াচড়ায় মাংসপেশি, রগ ও লিগামেন্টের সূক্ষ্ম টিস্যু ছিঁড়ে ব্যথা হয় (Rotator cuff problem)। মনে হবে ব্যথা জয়েন্টের ভেতর থেকে আসছে। রাতে ব্যথা বাড়ে, ব্যথায় ঘুম ভেঙে যায়, হাত পুরোপুরি নাড়ানো যায় না। কিছুদূর নাড়ালেই ব্যথায় আটকে যায়, মনে হয় জয়েন্ট শক্ত হয়ে গেছে। অথচ জয়েন্ট নিজে ঠিকই আছে, ব্যথা সহ্য করলে নাড়ানো যায়।
শক্ত কাঁধ (Frozen Shoulder বা Adhesive capsulitis): জয়েন্টের নানা টিস্যু আঠার মতো একটির সঙ্গে আরেকটি আটকে যায়। রোটেটর কাফের প্রদাহ থেকে এটি হয়। এ নিয়ে আলাদা লেখায় বিস্তারিত আছে।
আরও কয়েকটি কারণ
- রগের প্রদাহ, যেমন বাইসেপস টেন্ডনাইটিস, বাইসেপস টেন্ডন ছিঁড়ে যাওয়া
- জয়েন্টের কার্টিলেজ ছিঁড়ে গেলে প্রচণ্ড ব্যথা হয়, একদম ভেতর থেকে আসছে মনে হয়। নাড়াতে গেলে কচকচ শব্দ হতে পারে
- আশপাশের কোনো স্নায়ুতে চাপ লাগলে
- জয়েন্টের আশপাশের বার্সার (Bursa) প্রদাহ
- হার্ট অ্যাটাকের ব্যথাও কাঁধের জয়েন্টের ব্যথা মনে হতে পারে। এটি খুব জরুরি বিষয়
ডাক্তারের প্রশ্নগুলো
সঠিক রোগ নির্ণয়ে চিকিৎসক কিছু প্রশ্ন করবেন। আগে থেকে ভেবে রাখুন:
- ব্যথা ডান, বাম, না দুই কাঁধেই
- হঠাৎ শুরু হয়েছে কি না, তখন কী করছিলেন
- শরীরের অন্য কোথাও একই সঙ্গে ব্যথা আছে কি না
- আঙুল দিয়ে ব্যথার জায়গা দেখাতে পারেন কি না
- বিশ্রামেও ব্যথা থাকে কি না
- কোন নড়াচড়ায় বা কতটা নড়াচড়ার পর বাড়ে
- ব্যথা ছড়ানো, না নির্দিষ্ট জায়গায়
- ব্যথায় রাতে ঘুম হয় কি না
- কী করলে বাড়ে, কী করলে কমে
- কাজের ক্ষমতা কমে গেছে কি না
সঙ্গে আর কী কী লক্ষণ থাকতে পারে
- জয়েন্ট ফোলা, ওপরের চামড়া লাল, সঙ্গে জ্বর (সংক্রমণের লক্ষণ)
- নাড়াতে গেলে কচকচ শব্দ শোনা বা হাতে অনুভব করা (ভেতরে কিছু ছিঁড়লে এমন হয়)
- বাহুর নড়াচড়া কমে যাওয়া
- দৈনন্দিন ব্যক্তিগত কাজ করতে না পারা
কাঁধের জয়েন্টে প্রদাহ (Arthritis) হলে: নাড়াতেই ব্যথা, নড়াচড়ার সীমা অনেক কমে যাওয়া, ফোলা, চাপ দিলে ব্যথা বাড়া, শক্ত লাগা, জ্বর থাকতে পারে।
কাঁধের যত্ন
- শোয়া ও বসার ভঙ্গি ঠিক রাখুন
- প্রতি রাতে একই কাতে শোবেন না
- হাত মাথার ওপর তুলে বারবার কাজ করা এড়ান
- একই কাজ বারবার করলে মাঝে মাঝে হাতকে বিশ্রাম দিন
- শুধু এক কাঁধে ব্যাগ বা ভারী জিনিস বইবেন না
- ভারী জিনিস তুলতে হলে যতটা সম্ভব শরীরের কাছে রাখুন
সাধারণ চিকিৎসা
- কোনো আঘাতের পর ব্যথা হলে সরাসরি চিকিৎসকের কাছে যান
- ব্যথা সামান্য হলে কনুই ব্যাগে (elbow bag, কিনতে পাওয়া যায়) রেখে কনুই ও কাঁধকে বিশ্রাম দিন
- সাধারণ ব্যথার ওষুধ খান
- মৃদু গরম সেঁক দিন
- ব্যথা একটু কমলেই জয়েন্ট নাড়াচাড়া শুরু করতে হবে
- ফ্রোজেন শোল্ডারে ব্যথা লাগলেও চিকিৎসকের শেখানো মতো ব্যায়াম জোর করে করতে হয়
মূল কথা: জয়েন্টকে সচল রাখুন। বেশিদিন বিশ্রামে রাখলে নড়াচড়ার সীমা আরও কমে যাবে, হাত ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে যেতে পারে। কাঁধ পুরোপুরি বিশ্রামে রাখবেন না, আস্তে আস্তে হলেও নাড়ান: বাহু সামনে পেছনে, ওপরে নিচে এবং ভেতরে বাইরে ঘোরান। হঠাৎ ভারী কাজ বা জোর করে নাড়ানো করবেন না।
ব্যথার সময় যা এড়াবেন
- ঢিল ছোড়া
- টেনিস, ব্যাডমিন্টন, ভলিবল খেলা
- বেশি ভারী ওজন তোলা
- জোর করে মাথার ওপর হাত তোলা
কম্পিউটার ও কাঁধের ব্যথা
সারাক্ষণ কিবোর্ড ব্যবহারে কাঁধে ব্যথা হতে পারে। সমীক্ষা বলছে, একজন পেশাদার কম্পিউটার ব্যবহারকারী দিনে প্রায় দুই লক্ষ বার কিবোর্ডে চাপ দেন। এমন কাজে মাথাব্যথা, কোমরব্যথা, ঘাড়ব্যথাসহ শরীরের নানা জায়গায় ব্যথা হতে পারে।
দুই ঘণ্টা পরপর, প্রতিটি দশবার করে করুন:
- চেয়ারে সোজা হয়ে বসে দুই হাত মাথার ওপর এমন টান টান করে তুলুন যেন ঘরের ছাদ ছুঁতে চাইছেন
- সোজা বসে শরীর স্থির রেখে দুই হাত পিঠে ছোঁয়ান, আবার বুকে ছোঁয়ান। মাঝে মাঝে মাথার পেছনেও
- পিঠ ও মেরুদণ্ড সোজা রেখে থুতনি সামনে গুঁজে কাঁধ সামনে, পেছনে, ওপরে, নিচে ও গোল করে ঘোরান
- সোজা বসে কান দিয়ে কাঁধ ছোঁয়ার চেষ্টা করুন, দশ সেকেন্ড ধরে রাখুন। ডান, বাম, সামনে ও পেছনে করুন
- মাথা এমনভাবে নোয়ান যেন বগলের ঘ্রাণ নিতে চাইছেন। দশ সেকেন্ড ধরে রাখুন, দুই পাশেই
চেয়ারের বসার জায়গা মাটির সঙ্গে সমান্তরাল রাখুন।
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
- কোনো আঘাতের পর ব্যথা (সরাসরি যাওয়াই ভালো)
- হাত বা বাহু ব্যবহার করতে না পারা, নড়াচড়ায় ব্যথা
- আঘাতের পর কাঁধের আকার বিকৃত হলে
- ব্যথার সঙ্গে ফোলা, লাল ভাব ও জ্বর
- সাধারণ ব্যথার ওষুধ খাওয়ার পরও এক সপ্তাহের বেশি ব্যথা থাকলে
- বিশ্রামেও ব্যথা থাকলে
- কাঁধে ব্যথার সঙ্গে পেটে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট হলে (হার্ট ও পিত্তথলির সমস্যা)
- চুল আঁচড়াতে বা খোঁপা করতে হাত মাথার ওপরে তুলতে না পারলে
প্রতিরোধ ও ঘুমের নিয়ম
কাঁধের জয়েন্টের কিছু ব্যায়াম আছে (Stretching Exercise), চিকিৎসকের পরামর্শে করুন। ব্যায়াম হবে সর্বোচ্চ পরিধি পর্যন্ত নাড়ানোর (Range of movement), যা ফ্রোজেন শোল্ডার ঠেকাতে ও ভালো করতে সাহায্য করে। জয়েন্টকে বেশিদিন বিশ্রামে রাখা যাবে না।
ঘুমানোর সময়
- দৃঢ় বিছানা ব্যবহার করুন, নরমও নয় খুব শক্তও নয়
- মাথার নিচে দৃঢ় বালিশ, নরমও নয় খুব শক্তও নয়
- কাঁধের নিচে একটি দৃঢ় বালিশ রাখতে পারেন
- না বুঝলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
প্রশ্ন ও উত্তর
কাঁধ থেকে হাতের আঙুল পর্যন্ত ব্যথা কেন হয়?
- কনুই, কব্জি বা কাঁধে কোনো স্নায়ুতে চাপ
- কাঁধের আশপাশের রগ বা মাংসপেশির প্রদাহ
- বাহু বা হাতের রগের প্রদাহ
- কাঁধ, বাহু বা কব্জির স্নায়ুর কোনো রোগ
এমন হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কাঁধের ব্যথায় কী কী পরীক্ষা লাগতে পারে?
চিকিৎসকের পরামর্শমতো। এক্স-রেতে সাধারণত হাড়ের পরিবর্তন দেখা যায়। মাংসপেশি ও রগের পরিবর্তন দেখতে আল্ট্রাসনোগ্রাম বা এমআরআই লাগে।
কাঁধের সাধারণ ব্যায়াম কী?
চিকিৎসকের কাছ থেকে শিখে নিন: হাত ও বাহু দিয়ে কাঁধের মাংসপেশি টান টান করার ব্যায়াম, এবং হাতে হালকা ওজন নিয়ে ব্যায়াম।
শুধু বাহু ওপরে তুলতে গেলেই ব্যথা। কারণ কী?
- কাঁধের চারপাশের বার্সার প্রদাহ
- কোনো রগ ভেতরে কোথাও আটকে যাওয়া
- ফ্রোজেন শোল্ডারের প্রাথমিক অবস্থা
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। কাঁধের ব্যথার সঙ্গে বুকে ব্যথা বা শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণ থাকলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
শরীরের অন্য কোনো অঙ্গের সমস্যার কারণে কি কাঁধে ব্যথা হতে পারে?
হ্যাঁ, একে স্থানান্তরিত ব্যথা বলে; যেমন হার্ট অ্যাটাকের ব্যথা বাম বাহু ও কাঁধে এবং পিত্তথলি বা লিভারের অসুখের ব্যথা সাধারণত ডান কাঁধে অনুভূত হতে পারে। কাঁধ নাড়াতে ব্যথা না থেকে যদি বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা অতিরিক্ত ঘাম হয়, তবে এক মুহূর্ত দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে।
কাঁধে ব্যথা হলে কি হাত দীর্ঘদিন পুরোপুরি বিশ্রামে রাখা উচিত?
না, কাঁধের জয়েন্ট বেশিদিন বিশ্রামে রাখলে নড়াচড়ার সীমা আরও কমে হাত ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে যেতে পারে। ব্যথা একটু কমলেই আস্তে আস্তে বাহু সামনে-পেছনে, ওপরে-নিচে ও ঘুরিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করতে হবে এবং ফ্রোজেন শোল্ডারে চিকিৎসকের শেখানো ব্যায়াম নিয়মিত করতে হবে।
কাঁধের ব্যথার কারণ নির্ণয়ে কী কী পরীক্ষা লাগতে পারে?
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এক্স-রে করলে সাধারণত কাঁধের হাড়ের পরিবর্তন বোঝা যায়। আর মাংসপেশি ও রগের পরিবর্তন দেখার জন্য আল্ট্রাসনোগ্রাম বা এমআরআই পরীক্ষার প্রয়োজন হয়।
এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।