হিপ (Hip) মানে নিতম্ব। উরুর হাড়ের ওপরের অংশে যে জয়েন্ট, সেটিই হিপ জয়েন্ট। এই লেখায় আমরা "নিতম্বের জয়েন্টের ব্যথা" না বলে সংক্ষেপে "হিপ জয়েন্টের ব্যথা" বলব।
শুধু রোগীর মুখের কথা শুনে বোঝা কঠিন যে ব্যথাটা আসলেই হিপ জয়েন্ট থেকে আসছে কি না। রোগী নিজেও সহজে বুঝতে পারেন না, কারণ জয়েন্টের চারপাশে অনেক মাংসপেশি, রগ ও লিগামেন্ট আছে। পিঠ ও মেরুদণ্ডের ব্যথাও অনেক সময় হিপের ব্যথা বলে মনে হয়। তাই রোগ নির্ণয়ে রোগী ও চিকিৎসক, দুজনকেই সচেতন থাকতে হয়।
হিপ জয়েন্ট কেমন
হিপ জয়েন্ট খুব সুসংহত ও দৃঢ় একটি বল ও সকেট জয়েন্ট। উরুর হাড়ের ওপরের গোল মাথাটি নিতম্বের হাড়ের গোল গর্তে বসানো থাকে। বল ও সকেট গঠনের জন্য এটি অনেক দিকে ঘুরতে পারে। চারপাশ বড় বড় মাংসপেশি, রগ ও লিগামেন্টে ঘেরা, তাই সহজে স্থান থেকে সরে যায় না।
ক্যাপসুলের ভেতরে থাকে সাইনোভিয়াল আবরণ, যা থেকে এক ধরনের চটচটে তরল বের হয়ে জয়েন্টকে পিচ্ছিল রাখে। হাড়ের মাথায় লাগানো থাকে কার্টিলেজ। এতে স্নায়ু নেই, তাই কোনো অনুভূতিও নেই। এই কার্টিলেজের কারণেই হাড়ে হাড়ে ঘষা লাগে না এবং আমরা ব্যথাহীনভাবে চলতে পারি।
ব্যথার কারণ
- শরীরের মাত্রাতিরিক্ত ওজন, যাতে কার্টিলেজ নষ্ট হয়
- হিপ জয়েন্টের আর্থ্রাইটিস, এ ক্ষেত্রে ব্যথা সাধারণত উরুর সামনের দিকে থাকে
- হিপ জয়েন্টে আঘাত: মচকানো, হাড় ভাঙা, জয়েন্ট স্থানচ্যুত হওয়া
- হিপ জয়েন্টে ইনফেকশন, যা বাচ্চাদের বেশি হয়
- বাচ্চাদের ক্ষেত্রে কোনো কারণ ছাড়াই জয়েন্টে প্রদাহ
- সাইনোভিয়াল আবরণের প্রদাহ
- জোর করে পায়ের অতিরিক্ত ব্যায়াম, বেশি দৌড়ানো, হঠাৎ মাঠে অনেক খেলাধুলা, অতিরিক্ত নাচ, হঠাৎ ব্যায়ামের ধরন বদলানো
- বার্সাইটিস (আশপাশের টিস্যুর প্রদাহ) ও রগের প্রদাহ
- আশপাশের স্নায়ুতে চাপ
- বয়স্কদের ক্ষেত্রে হাড়ের ক্যান্সার (মূলত অন্য জায়গা থেকে ছড়ানো)
- হাড়ে রক্ত চলাচল কমে যাওয়া (Avascular Necrosis)
- হাড়ের ইনফেকশন
- অস্টিওপোরোসিস
- পিঠ ও মেরুদণ্ডের ব্যথাও হিপের ব্যথা বলে মনে হতে পারে
হিপের পেছনের দিকে ব্যথা: এটি সাধারণত হিপ জয়েন্ট থেকে আসে না। জয়েন্টের পেছনের মাংসপেশি, রগ ও লিগামেন্টের খিঁচুনি বা মচকানো থেকে হয়। জয়েন্ট নিজে তখন ভালো থাকে। মেরুদণ্ডের ব্যথাও হিপের পেছনে অনুভূত হতে পারে। আর হিপ জয়েন্টের নিজের অসুখের ব্যথা সাধারণত উরুর সামনের দিকে থাকে এবং হাঁটু পর্যন্ত নামে। রোগীর অভিযোগ আর চিকিৎসকের পরীক্ষার পরই নিশ্চিত হওয়া যায়।
হিপ ব্যথার সঙ্গে আর যা থাকতে পারে
- দাঁড়ানো, হাঁটা, ওঠাবসা, সিঁড়ি ভাঙা, নিচু হওয়া, সব অবস্থাতেই ব্যথা
- খুঁড়িয়ে হাঁটা
- বিশ্রামের সময়ও ব্যথা
- জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া, নড়াচড়া কমে যাওয়া
- উরুর ওপরের অংশে সামনের দিকে ফোলা, চামড়া লাল ও গরম
- জয়েন্ট নাড়ালেই ব্যথা, চাপ দিলে ব্যথা বাড়া
- ব্যথা উরুর সামনে দিয়ে হাঁটুর ওপর পর্যন্ত নামা
- পায়ে দুর্বলতা, অবশ ভাব, অনুভূতি কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া
- ব্যথার কারণে ঘুমের ব্যাঘাত
বুঝবেন কীভাবে এটা হিপ জয়েন্টেরই আর্থ্রাইটিস?
- জয়েন্ট নাড়াতে শক্ত শক্ত লাগে
- চাপ দিলে ব্যথা বাড়ে
- ব্যথা উরুর বাইরের দিকে থাকতে পারে
- কুঁচকিতে ব্যথা থাকে
- হাঁটু ও নিতম্বেও ব্যথা অনুভূত হতে পারে
- সকালে ঘুম থেকে উঠে বা কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর হাঁটা শুরুর সময় ব্যথা বাড়ে, কিছুক্ষণ হাঁটলে কমে
সাধারণ চিকিৎসা
বেশি হাঁটা, দৌড়ানো, মাত্রাতিরিক্ত ব্যায়াম বা হঠাৎ অনেক খেলাধুলার কারণে ব্যথা হলে সাধারণ চিকিৎসাতেই ভালো ফল পাওয়া যায়:
- বিশ্রাম
- সাধারণ ব্যথার ওষুধ
প্রতিরোধের উপায়
- ঘুম থেকে উঠে চিকিৎসকের পরামর্শমতো একটি সঠিক ব্যায়াম করুন
- ওজন স্বাভাবিকের কাছাকাছি রাখুন
- সুষম খাবার খান, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি রাখুন খাবারে
- চিকিৎসকের উপদেশমতো স্ট্রেচিং ব্যায়াম করুন
- নিয়মিত সাঁতার ও সাইকেল চালান। এগুলো জয়েন্টের ওপর কম চাপ ফেলে
- লাফালাফির মতো ধাক্কা লাগে এমন কাজ এড়িয়ে চলুন
- খেলাধুলার জন্য সঠিক পোশাক ও জুতা পরুন, খেলার আগে ভালোভাবে ওয়ার্ম আপ করুন
- যে কাজে ব্যথা বাড়ে, তা সতর্কতার সঙ্গে এড়ান
- মাটিতে পড়ে যাওয়া বা হোঁচট খাওয়া থেকে বাঁচতে সাবধানে চলুন
- শরীরের সংকেতের দিকে মনোযোগ দিন
কখন অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাবেন
- উঁচু থেকে বা মেঝেতে পড়ে গিয়ে হিপে ব্যথা হলে
- সাধারণ ওষুধ খাওয়ার পরও দুই সপ্তাহে ব্যথা না কমলে
- ব্যথার কারণে প্রতিদিনের কাজ ব্যাহত হলে: হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা, ওঠাবসা, বসার পর নড়তে না পারা
- ব্যথার সঙ্গে হিপ ফুলে গেলে (সাধারণত সামনের দিকে) ও গরম হলে
- ব্যথার সঙ্গে জ্বর থাকলে
- ব্যথার সঙ্গে দিন দিন ওজন কমলে ও খাবারে রুচি কমলে। তখন বিশেষ সতর্ক হোন এবং চিকিৎসকের পরামর্শমতো পরীক্ষা করিয়ে কারণ খুঁজে বের করুন
- ব্যথার সঙ্গে পায়ে দুর্বলতা ও অবশ ভাব থাকলে
হিপ জয়েন্টের ব্যথায় কেমন বিছানা ভালো
- বিছানা হতে হবে দৃঢ় (Firm)। খুব নরমও নয়, খুব শক্তও নয়
- যে কোনো এক কাতে ঘুমানো ভালো। যেদিকে ব্যথা, সেদিকটা ওপরে রাখুন
- হাঁটু ও হিপ জয়েন্ট এমনভাবে ভাঁজ করে রাখুন, যেন বাংলা "দ" অক্ষরের মতো দেখায়
- দুই দিকেই ব্যথা থাকলে চিত হয়ে ঘুমান, তবে পায়ের নিচে বালিশ রাখুন যেন হাঁটু একদম সোজা না থাকে
- খুব নরম বা খুব শক্ত বিছানার কারণেও হিপের ব্যথা হতে পারে
মেয়েদের হিপ জয়েন্টে ব্যথার কারণ
- হিপ জয়েন্টের আর্থ্রাইটিস
- আশপাশের রগ বা বার্সার প্রদাহ
- অস্টিওপোরোসিস
- নিতম্বের হাড় ভেঙে যাওয়া, কখনো আপনা আপনি
- জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের অনেক রোগের ব্যথাও হিপের ব্যথা বলে মনে হতে পারে
কখন হিপ জয়েন্ট প্রতিস্থাপন (Replacement) লাগে
- হাঁটার সময় এবং বিশ্রামের সময়ও ব্যথা, দীর্ঘদিন ব্যথার ওষুধ খেয়েও কোনো পরিবর্তন না হলে
- ব্যায়াম করতে গেলে প্রচণ্ড ব্যথা, ব্যথার কারণে ব্যায়াম করাই না গেলে
- জয়েন্ট এতটা শক্ত হয়ে গেলে যে নিজের জুতা মোজা নিজে পরতে পারেন না
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। হিপে ব্যথার সঙ্গে ওপরের কোনো সতর্ক লক্ষণ থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
হিপের পেছনের দিকের ব্যথা কি আসলেই হিপ জয়েন্ট থেকে আসে?
সাধারণত না; হিপের পেছনের ব্যথা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পেছনের মাংসপেশি, রগ ও লিগামেন্টের খিঁচুনি বা মচকানো কিংবা মেরুদণ্ডের সমস্যা থেকে আসে। হিপ জয়েন্টের নিজের অসুখের ব্যথা সাধারণত কুঁচকি বা উরুর সামনের দিকে থাকে এবং হাঁটু পর্যন্ত নামতে পারে।
হিপ জয়েন্টের ব্যথায় কেমন বিছানায় এবং কীভাবে ঘুমানো ভালো?
খুব নরম বা খুব শক্ত নয়, এমন দৃঢ় (Firm) বিছানায় এক কাতে শুয়ে যেদিকে ব্যথা সেদিকটা ওপরে রাখা ভালো এবং হাঁটু ও হিপ ভাঁজ করে বাংলা 'দ' অক্ষরের মতো রাখা উচিত। দুই দিকেই ব্যথা থাকলে চিত হয়ে পায়ের নিচে বালিশ দিয়ে ঘুমানো ভালো যাতে হাঁটু একদম সোজা না থাকে।
কখন হিপ জয়েন্ট প্রতিস্থাপন (Replacement) করার প্রয়োজন হয়?
হাঁটার সময় ও বিশ্রামের সময় ব্যথা থাকলে এবং দীর্ঘদিন ব্যথার ওষুধ খেয়েও কোনো পরিবর্তন না হলে হিপ জয়েন্ট প্রতিস্থাপন লাগতে পারে। এছাড়া প্রচণ্ড ব্যথায় ব্যায়াম করাই সম্ভব না হলে কিংবা জয়েন্ট এত শক্ত হয়ে গেলে যে নিজের জুতা-মোজা নিজে পরা যায় না, তখনও এটি প্রয়োজন হয়।
এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।