কাঁধের জয়েন্ট শক্ত বা টাইট হয়ে যাওয়ার এই সমস্যাকে বলা হয় ফ্রোজেন শোল্ডার (Frozen Shoulder)। এর আরেক নাম অ্যাডহেসিভ ক্যাপসুলাইটিস (Adhesive Capsulitis)। রোগটা বুঝতে হলে আগে কাঁধের জয়েন্ট কীভাবে কাজ করে, সেটা একটু জানা দরকার।
কাঁধের জয়েন্ট কেমন
তিনটি বড় হাড় মিলে কাঁধে একটি বল আর সকেটের মতো গঠন তৈরি করে। একটি শক্ত ক্যাপসুল এবং রোটেটর কাফ (Rotator Cuff) নামের কয়েকটি মাংসপেশির রগ বলটিকে সকেটে ধরে রাখে। এতে জয়েন্ট স্থান থেকে সরে না গিয়েও অনেকটা ঘুরতে পারে। আরও আরামে নড়াচড়ার জন্য জয়েন্টের ভেতরে সাইনোভিয়াল ফ্লুইড (Synovial Fluid) নামের এক পিচ্ছিল তরল তৈরি হয়, যা আসে অতি পাতলা সাইনোভিয়াল আবরণ থেকে।
ফ্রোজেন শোল্ডারে কী ঘটে
প্রথমে ওই পাতলা সাইনোভিয়াল আবরণে প্রদাহ হয়। ধীরে ধীরে প্রদাহ ক্যাপসুল ও রোটেটর কাফের রগেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ক্যাপসুল ও রগ মোটা, শক্ত ও টাইট হয়ে যায়, টিস্যুগুলো একে অপরের সঙ্গে আটকে যায়, আর জয়েন্টের তরলও কমে যায়। তখন জয়েন্ট নাড়ানো কষ্টকর হয়ে পড়ে, নড়াচড়ার পরিধি কমে যায় এবং নাড়াতে গেলে প্রচণ্ড ব্যথা হয়।
কেন হয়
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সঠিক কারণ জানা যায় না। তবে:
- সাধারণত ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সে বেশি হয়
- যে কোনো হাতে হতে পারে, এমনকি একসঙ্গে দুই হাতেও
- নারীরা বেশি ভোগেন (প্রায় ৭০ শতাংশ)
ঝুঁকি বাড়ায় যা
- কাঁধে আঘাত পাওয়া
- কাঁধের ইনফেকশন, সঠিক চিকিৎসা না নিলে
- যে কোনো কারণে কাঁধের জয়েন্টে প্রদাহ
- কাঁধের অপারেশনের পর
- ডায়াবেটিস। ডায়াবেটিসের রোগীদের সম্ভাবনা অনেক বেশি, লক্ষণও বেশি মারাত্মক হয়, জয়েন্ট আরও শক্ত হয় এবং সারতেও বেশি সময় লাগে
- থাইরয়েড গ্রন্থির কিছু রোগ, হৃদরোগ ও স্ট্রোক
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, কোনো কারণে কাঁধের নড়াচড়া কিছুদিন বন্ধ থাকা। যেমন কনুই বা হাতের হাড় ভেঙে গেলে, হাতে অপারেশন হলে বা অন্য কোনো আঘাতে হাত নাড়ানো বন্ধ থাকলে। এটি প্রায়ই দেখা যায়।
লক্ষণ
লক্ষণ ধীরে ধীরে শুরু হয়, দিন দিন খারাপ হয় এবং কিছুদিন পর ব্যথা আবার ধীরে ধীরে কমে আসে। হঠাৎ করে এটা হয় না।
- প্রথমে কাঁধ নাড়ালে ব্যথা, পরে সবসময় ব্যথা
- কয়েকদিন পর জয়েন্ট একটু টাইট টাইট লাগে, নড়াচড়ার পরিধি কমতে থাকে
- প্রথমে হাত ওপরে তুলতে কষ্ট হয়। পরে নিজের পিঠ চুলকানো, চুল আঁচড়ানো বা খোঁপা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে
- নিজে নাড়ালেও, অন্য কেউ নাড়িয়ে দিলেও নড়াচড়ার পরিধি বাড়ে না
- ব্যথা বেশিরভাগ জয়েন্টের বাইরের দিকে অনুভূত হয়, কখনো বাহুর ওপরের দিকেও
সুখবর হলো, প্রায় ৯০ শতাংশ রোগী কাঁধের কিছু সাধারণ ব্যায়াম আর ব্যথার ওষুধেই ভালো হয়ে যান।
ঘরে যা করবেন
- সাধারণ ব্যথার ওষুধ খান
- চিকিৎসকের পরামর্শে জয়েন্টে গরম সেঁক দিন
- আস্তে আস্তে জয়েন্ট নাড়ানোর চেষ্টা করুন। ব্যথা থাকলেও সহ্যের মধ্যে একটু জোর দিয়ে ধীরে ধীরে নড়াচড়ার পরিধি বাড়ান। কখনো হঠাৎ ঝটকা দিয়ে জয়েন্ট নাড়াবেন না, তাতে ব্যথা বাড়ে এবং সারতে বেশি সময় লাগে
- চিকিৎসকের পরামর্শমতো ব্যায়াম করুন
- ব্যায়ামের ফাঁকে জয়েন্টকে বিশ্রামে রাখুন
কোন কোন ব্যায়াম করবেন (চিকিৎসকের কাছ থেকে শিখে নিন):
- পেন্ডুলামের মতো হাত দোলানো
- দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে আঙুল দিয়ে হাঁটার মতো করে ধীরে ধীরে হাত ওপরে ওঠানো (ফিঙ্গার ওয়াক)
- হাত ও বাহু আস্তে আস্তে বাইরের দিকে ও ভেতরের দিকে ঘোরানো
- পিঠের দিকে এক হাত দিয়ে অন্য হাত ধরার চেষ্টা
এই ব্যায়ামগুলো প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর ২ থেকে ৩ মিনিট করে করুন।
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
- সাধারণ ওষুধেও ব্যথা না কমলে, বরং দিন দিন বাড়লে
- জয়েন্ট নাড়ানোর পরিধি দিন দিন কমতে থাকলে
- রাতে ব্যথা বেড়ে ঘুম নষ্ট হলে
- প্রতিদিনের ব্যক্তিগত কাজ করতে না পারলে
- ব্যথার কারণে ব্যায়ামই শুরু করা না গেলে
- ব্যথার সঙ্গে জ্বর থাকলে
প্রশ্ন ও উত্তর
বেশি ব্যথা নিয়ে কীভাবে ঘুমাবেন?
চিত হয়ে শুয়ে কাঁধের নিচে একটি বালিশ দিন, হাত পেটের ওপর রাখুন। কাত হয়ে শুতে চাইলে যেদিকে ব্যথা কম, সেদিকটা নিচে রাখুন এবং ব্যথার হাত দিয়ে একটি কোলবালিশ জড়িয়ে ধরুন। বসে থাকতে চাইলে পেছনে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসুন, কাঁধের পেছনে একটি ছোট নরম বালিশ রাখতে পারেন।
গরম সেঁক দেব?
হ্যাঁ। অনেক সময় বেশ আরাম পাওয়া যায়।
মালিশ করব?
হ্যাঁ, নিয়ম মেনে চিকিৎসকের পরামর্শে। মালিশে মাংসপেশি শিথিল হয়, রক্ত চলাচল বাড়ে, ব্যথা কিছুটা কমে।
সাঁতার কাটা যাবে?
ব্যথা থাকা অবস্থায় সাঁতারে ব্যথা বাড়তে পারে। আগে সঠিক চিকিৎসা ও ব্যায়াম শুরু করুন। ব্যথা একটু কমলে সাঁতার শুরু করা যাবে।
ব্যথা রাতে বাড়ে কেন?
দিনের বেলায় হাতের কিছু না কিছু নড়াচড়া হয়, তাই জয়েন্টের বিভিন্ন অংশের মধ্যে চাপ কমে। রাতে ঘুমের মধ্যে অসুস্থ কাঁধের দিকে কাত হয়ে শুলে ব্যথা বাড়তে পারে।
এটি কি আপনা আপনি ভালো হয়?
হ্যাঁ, হতে পারে। তবে সময় লাগবে, কখনো এক বছর বা তার বেশি। সঠিক চিকিৎসা না নিলে জয়েন্ট পুরোপুরি আগের অবস্থায় নাও ফিরতে পারে।
এটি কি স্থায়ী হয়ে যাবে?
না। তবে ঠিকমতো চিকিৎসা না নিলে অনেকদিন ভুগতে হতে পারে।
চিকিৎসা না নিলে হাত কি অকেজো হয়ে যাবে?
হতে পারে। দিন দিন নড়াচড়ার পরিধি কমে হাত প্রায় অচল হয়ে যেতে পারে।
সঠিক চিকিৎসায় কি পুরোপুরি ভালো হয়?
হ্যাঁ, অবশ্যই। তবে ২ থেকে ৬ মাস সময় লাগতে পারে।
খাবারের সঙ্গে কি এর সম্পর্ক আছে?
হ্যাঁ। কিছু খাবার জয়েন্টের প্রদাহ বাড়াতে পারে। যতটা সম্ভব এগুলো কম খান:
- সব ধরনের ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার
- বেকারির খাবার
- সাদা চিনি, সাদা আটা, সাদা চাল
- দুগ্ধজাত খাবার
- তামাক ও মদ
- লবণ
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। কাঁধের ব্যথা বাড়লে বা নড়াচড়া কমতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ফ্রোজেন শোল্ডারে কাদের ঝুঁকি বেশি থাকে?
সাধারণত ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সে এবং পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে ফ্রোজেন শোল্ডার বেশি দেখা যায়। এছাড়া ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা, হৃদরোগ, কাঁধে আঘাত বা অপারেশন এবং কোনো কারণে কিছুদিন কাঁধের নড়াচড়া বন্ধ থাকলে এর ঝুঁকি অনেক বাড়ে।
ফ্রোজেন শোল্ডারে বেশি ব্যথা থাকলে রাতে কীভাবে ঘুমাবেন?
চিত হয়ে শুলে কাঁধের নিচে একটি বালিশ দিয়ে হাত পেটের ওপর রাখতে পারেন। কাত হয়ে শুতে চাইলে যেদিকে ব্যথা কম সেদিকে কাত হয়ে শুয়ে ব্যথার হাত দিয়ে একটি কোলবালিশ জড়িয়ে ধরলে আরাম পাওয়া যায়।
ফ্রোজেন শোল্ডার কি সঠিক চিকিৎসায় পুরোপুরি ভালো হয়?
হ্যাঁ, প্রায় ৯০ শতাংশ রোগী কাঁধের সাধারণ কিছু ব্যায়াম ও ব্যথার ওষুধেই ভালো হয়ে যান। সঠিক চিকিৎসা ও নিয়মিত ব্যায়ামে পুরোপুরি সুস্থ হতে সাধারণত ২ থেকে ৬ মাস সময় লাগতে পারে।
এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।