আর্থ্রাইটিস (Arthritis) মানে সহজ কথায় জয়েন্টের প্রদাহ। "আর্থ" শব্দের অর্থ জয়েন্ট, আর "আইটিস" মানে প্রদাহ। এই রোগ একটি নয়, প্রায় একশো ধরনের আর্থ্রাইটিস আছে। প্রত্যেকটির কারণ আলাদা, চিকিৎসাও আলাদা।
কোন কোন আর্থ্রাইটিস বেশি দেখা যায়
- অস্টিওআর্থ্রাইটিস (Osteoarthritis)
- রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (Rheumatoid Arthritis)
- গাউট (Gout)
- জয়েন্টে ইনফেকশনজনিত আর্থ্রাইটিস (Septic Arthritis)
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ ভোগেন অস্টিওআর্থ্রাইটিসে, তারপর রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে। এই লেখায় মূলত এই দুটি নিয়েই কথা বলা হয়েছে।
অস্টিওআর্থ্রাইটিস: ক্ষয়ে যাওয়া জয়েন্ট
দুটি হাড় যেখানে মিলে জয়েন্ট তৈরি করে, সেখানে হাড়ের মাথা কার্টিলেজ (Cartilage) নামের মসৃণ আবরণে ঢাকা থাকে। এই আবরণ দুর্বল হলে বা অতিরিক্ত ব্যবহারে নষ্ট হলে জয়েন্টও ধীরে ধীরে নষ্ট হতে থাকে।
কার্টিলেজ নষ্ট হওয়ার সাধারণ কারণগুলো:
- আঘাত লেগে কার্টিলেজ ফেটে যাওয়া
- জয়েন্টে ইনফেকশন
- শরীরের বাড়তি ওজন
- অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস
- আগে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস হয়ে থাকা
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস: শরীর যখন নিজের বিরুদ্ধে লড়ে
এর সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি। ধারণা করা হয়, শরীরের রোগ প্রতিরোধকারী কোষ ভুল করে নিজের কোষকেই বাইরের শত্রু ভাবে এবং আক্রমণ করে বসে। এতে প্রদাহ তৈরি হয় এবং জয়েন্টের ক্ষতি হয়। প্রথমে জয়েন্টের ভেতরের সাইনোভিয়াল পর্দা আক্রান্ত হয়, পরে পুরো জয়েন্ট নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
জেনে রাখা ভালো:
- প্রায় ১০০ জনের মধ্যে একজন এই রোগে ভোগেন।
- পুরুষের তুলনায় নারীরা প্রায় তিন গুণ বেশি আক্রান্ত হন। অনেক সময় দেখা যায়, মায়েরও একই সমস্যা ছিল।
- যে কোনো বয়সে হতে পারে, তবে সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সে বেশি হয়। শিশু ও তরুণদের মধ্যেও হতে পারে।
- এই রোগ পুরোপুরি সারে না, তবে ঠিকমতো চিকিৎসায় নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
- রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে ভোগা কারও কারও হৃদরোগের ঝুঁকিও থাকতে পারে।
কোন জয়েন্টে কোন আর্থ্রাইটিস
- রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস: সাধারণত প্রথমে হাত ও পায়ের ছোট জয়েন্টে শুরু হয়, যেমন আঙুলের জয়েন্ট ও কব্জি।
- অস্টিওআর্থ্রাইটিস: বড় জয়েন্টে বেশি হয়, যেমন হাঁটু, কোমর, মেরুদণ্ড ও গোড়ালির জয়েন্ট।
- ইনফেকশনজনিত আর্থ্রাইটিস: যে কোনো জয়েন্টে হতে পারে, তবে নিতম্ব, হাঁটু ও গোড়ালির মতো বড় জয়েন্টে বেশি দেখা যায়।
লক্ষণগুলো কী কী
- জয়েন্টে ব্যথা ও ফোলা
- জয়েন্টের ওপরের চামড়া গরম হয়ে থাকা
- জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া
- ধীরে ধীরে জয়েন্ট নাড়ানোর পরিধি কমে আসা
- জ্বর থাকতে পারে
লক্ষণ দেখে, রোগের ইতিহাস শুনে এবং কয়েকটি পরীক্ষায় রোগ ধরা পড়ে। প্রয়োজন হতে পারে রক্তের কিছু পরীক্ষা, জয়েন্টের এক্স রে, আলট্রাসাউন্ড বা এমআরআই। কোন পরীক্ষা লাগবে, তা চিকিৎসক ঠিক করবেন।
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
- জয়েন্ট ফুলে গেলে এবং নাড়াতে না পারলে
- জয়েন্ট লাল ও গরম হলে
- ব্যথার সঙ্গে জ্বর থাকলে
- জয়েন্টে চাপ দিলে ব্যথা লাগলে
- তিন দিনের বেশি ব্যথা থাকলে
- এক মাসের মধ্যে কয়েকবার ব্যথা ফিরে এলে
খাওয়াদাওয়া: কী খাবেন, কী এড়াবেন
আর্থ্রাইটিসের জন্য সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ করে এমন কোনো বিশেষ খাবার নেই। একজনের যা উপকারী, অন্যজনের তা না-ও হতে পারে। নিজের শরীরে কোনটা ভালো কাজ করে, তা খেয়াল করে একটি নিজস্ব খাবারের পরিকল্পনা করা যায়। মূল কথা দুটি: ওজন স্বাভাবিক রাখা এবং সুষম খাবার খাওয়া।
যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন
- মদ ও সিগারেট
- চিনি
- টিনজাত খাবার (এতে লবণ ও তেল বেশি থাকে)
- বাড়তি লবণ
- ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার
যেসব খাবার উপকার দিতে পারে
- আদা
- গ্রিন টি
- কাঁচা হলুদ
- অলিভ অয়েল
- সব ধরনের বাদাম
- কুমড়ার বীজ
- অ্যালোভেরা
- ফ্ল্যাক্স সিড
জীবনযাত্রায় যে বদলগুলো সত্যিই কাজে লাগে
ব্যথা, ফোলা ও জ্বর নিয়ন্ত্রণে এলে কিছু অভ্যাস বদলে অনেকেই প্রায় স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারেন।
- গোসলে হালকা গরম পানি ব্যবহার করুন। শরীরে ঠান্ডা পানি লাগানো এড়িয়ে চলুন।
- ফ্যানের বাতাস সরাসরি গায়ে লাগাবেন না। এসি ঘরে থাকলে শরীর ভালোভাবে ঢেকে রাখুন।
- ওজন স্বাভাবিক রাখুন। বাড়তি ওজন জয়েন্টের ওপর মারাত্মক চাপ ফেলে।
- জয়েন্ট সচল রাখতে সহজ ব্যায়াম করুন। সাঁতার খুব ভালো ব্যায়াম, তবে হালকা গরম পানিতে, যেমন সুইমিং পুলে। ঠান্ডা পানিতে সাঁতার কেটে তেমন লাভ হয় না।
- হিটিং প্যাড ব্যবহার করলে আরাম পাওয়া যায়।
- প্রয়োজনে লাঠি বা ওয়াকার ব্যবহার করুন। টয়লেটের উচ্চতা ঠিক করে নিলেও অনেক সুবিধা হয়।
- যে কাজে ব্যথা বাড়ে, তা এড়িয়ে চলুন।
- নিয়মিত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন।
একটি সহজ নিয়ম মনে রাখতে পারেন: বাহন থাকলে হাঁটব না, বসার জায়গা থাকলে দাঁড়িয়ে থাকব না। অর্থাৎ একটু দূরের পথে বাহন নিন, আর দাঁড়িয়ে আড্ডা দেওয়া বা দাঁড়িয়ে কাজ করার অভ্যাস কমান। তবে হাঁটাহাঁটি একেবারে বন্ধ করা নয়।
ভিটামিন ও সম্পূরক নিয়ে কথা
কোনো কোনো আর্থ্রাইটিসে ভিটামিন ডি, ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লুকোজামিন উপকারী হতে পারে। তবে এগুলো অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবেন।
দীর্ঘমেয়াদে ভালো থাকার দৃষ্টিভঙ্গি
আর্থ্রাইটিসে একবার জয়েন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা আর পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফেরে না। কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি বদলে, চিকিৎসকের উপদেশ মেনে এবং ঠিক চিকিৎসা নিলে অনেকটাই স্বাভাবিক জীবন কাটানো সম্ভব।
- ব্যথা ও অবসাদের ওষুধ নিয়ম মেনে খান।
- চলমান থাকুন। হাঁটাহাঁটি ও সঠিক ব্যায়াম করুন, তবে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে।
- কাজ ও বিশ্রামের মধ্যে ভারসাম্য রাখুন।
- সুষম খাবার খান।
- পর্যাপ্ত ঘুমান।
- প্রতিটি জয়েন্টের জন্য আলাদা ব্যায়াম আছে। চিকিৎসকের কাছ থেকে ভালো করে শিখে নিন। নিজে নিজে নতুন কিছু শুরু করবেন না।
আর্থ্রাইটিস যেন না বাড়ে, সে জন্য
- মনোবল ধরে রাখুন। বিশ্বাস রাখুন যে ব্যায়াম করে আপনি ভালো থাকতে পারবেন।
- ওজন বাড়তে দেবেন না।
- সারাদিন ঘরে বসে থাকা এড়িয়ে চলুন।
- ধূমপান ছাড়ুন।
- প্যাকেটজাত খাবার ও চিনি যতটা সম্ভব বাদ দিন।
- ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- লাঠি বা হাঁটার সহায়ক ব্যবহারে লজ্জা পাবেন না। চিকিৎসকের পরামর্শমতো ব্যবহার করুন।
- "আমি পুরোপুরি ভালো হয়ে গেছি" এমন ভাবা ঠিক নয়। বরং মনে রাখুন, নিয়ম মেনে চললে আমি ভালো থাকব।
আপনার প্রশ্ন, সহজ উত্তর
মালিশ কি উপকারী?
অনেক সময় উপকারী। মালিশে মাংসপেশিতে রক্ত চলাচল বাড়ে, মাংসপেশি বেশি সক্রিয় হয়, ব্যথা কমে এবং শক্ত জয়েন্টের নড়াচড়া সহজ হয়। মনও শান্ত হয়। তবে মালিশ কতটা চাপে হবে, সেটা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ঠিক করুন।
হাঁটুর আর্থ্রাইটিসে হাঁটাহাঁটি করা যাবে?
ব্যথা অল্প হলে হালকা হাঁটাহাঁটি করতে পারেন, সঙ্গে অন্য ব্যায়ামও। ব্যথা বেশি থাকলে হাঁটা বন্ধ রাখুন। ব্যথা সহনীয় হলে আবার শুরু করুন। প্রথমে হালকা ব্যায়াম, তারপর হাঁটা, এই ক্রমটা ভালো। এতে হাঁটুর শক্ত ভাব কমে, উরু ও পায়ের মাংসপেশি শক্তিশালী হয়, ভারসাম্য ফিরে আসে এবং ব্যথাও কমে।
ব্যথা কি সবসময় একই রকম থাকে?
না। কখনো বাড়ে, কখনো কমে। দিনের এক সময় বেশি থাকে, অন্য সময় কম। ব্যথা কমে গেলেই বুঝে নেবেন না যে পুরোপুরি সেরে গেছেন।
ঠান্ডা সেঁক, নাকি গরম সেঁক?
ব্যথা খুব বেশি হলে ঠান্ডা সেঁক দিন। একটু কমলে গরম সেঁক দিতে পারেন।
হাঁটুর আর্থ্রাইটিসে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করব?
একদম বন্ধ করবেন না। আস্তে আস্তে, এক ধাপ এক ধাপ করে উঠুন ও নামুন। এতে হাঁটু ও পায়ের রক্ত চলাচল বাড়ে, মাংসপেশি শক্তি ফিরে পায়, হাঁটু সচল থাকে। মনও ভালো থাকে।
হাঁটু মুড়ে নিচে বসা যাবে?
অনেকের ধারণা, হাঁটুতে ব্যথা থাকলে মুড়ে বসা যাবে না। অথচ ব্যথা কমে এলে এটাই সবার আগে শুরু করা উচিত। না করলে হাঁটু চিরদিনের মতো মুড়ে বসার ক্ষমতা হারাতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যথা একটু কমলেই হালকা ব্যায়ামের সঙ্গে মুড়ে বসার চেষ্টা শুরু করুন।
শুরু করুন ওয়াল স্কোয়াট (Wall Squat) দিয়ে। দেয়ালে পিঠ চেপে ধরে ধীরে ধীরে, নিয়ন্ত্রিতভাবে নিচের দিকে বসুন। বেশি ব্যথা লাগলে থেমে যান। এর সঙ্গে হাঁটুর ওপর শরীরের ওজন না পড়ে এমন ব্যায়াম করুন। যেমন বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে শূন্যে সাইকেল চালানো। এটা চিকিৎসকের কাছ থেকে শিখে নেবেন। এতে উরু ও পায়ের মাংসপেশি শক্ত হয় এবং হাঁটতে কষ্ট কমে।
হাঁটুতে খুব ব্যথা হলে কী করব?
- চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যথার ওষুধ খান।
- ব্যথা ও ফোলা বেশি থাকলে ঠান্ডা সেঁক দিন। ব্যথা সহনীয় হলে গরম সেঁক এবং রাতে হিটিং প্যাড ব্যবহার করতে পারেন।
- হালকা গরম পানিতে গোসল করুন।
হঠাৎ ব্যথা বেড়ে যায় কেন?
- বেশি হাঁটাহাঁটি বা সিঁড়ি ওঠানামা
- হাঁটুতে আঘাত
- ঠান্ডা আবহাওয়া
- হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া
- জয়েন্টে ইনফেকশন
- আগে থেকেই হাঁটুর আকার বা আকৃতিতে পরিবর্তন থাকা
ব্যায়াম করলে কি জয়েন্ট আগের অবস্থায় ফিরবে?
কার্টিলেজ একবার নষ্ট হয়ে গেলে নতুন করে তৈরি হয় না। তবে নষ্ট হওয়ার আগে সঠিক চিকিৎসা শুরু করলে জয়েন্ট ভালো অবস্থায় থাকতে পারে। ব্যায়াম করলে জয়েন্টের আশপাশের মাংসপেশি ও অন্যান্য টিস্যু শক্ত হয়, ফলে জয়েন্ট আরও সুরক্ষিত থাকে এবং আমরা ব্যথা ছাড়া চলাফেরা করতে পারি। তাই চিকিৎসকের পরামর্শে নিজের জয়েন্টের জন্য সঠিক ব্যায়াম আজই শুরু করুন।
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। নিজের অবস্থার জন্য সঠিক চিকিৎসা ও ব্যায়াম অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
অস্টিওআর্থ্রাইটিস ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস সাধারণত কোন জয়েন্টে বেশি হয়?
অস্টিওআর্থ্রাইটিস সাধারণত হাঁটু, কোমর, মেরুদণ্ড ও গোড়ালির মতো বড় জয়েন্টে বেশি হয়। অন্যদিকে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস সাধারণত প্রথমে হাত ও পায়ের ছোট জয়েন্টে, যেমন আঙুলের জয়েন্ট ও কব্জিতে শুরু হয়।
হাঁটুর আর্থ্রাইটিসে কি হাঁটাহাঁটি করা যাবে?
ব্যথা অল্প হলে হালকা ব্যায়ামের পাশাপাশি হালকা হাঁটাহাঁটি করা যায়, তবে ব্যথা বেশি থাকলে হাঁটা বন্ধ রাখতে হবে। ব্যথা সহনীয় হলে প্রথমে হালকা ব্যায়াম এবং তারপর হাঁটা শুরু করলে হাঁটুর শক্ত ভাব ও ব্যথা কমে এবং পায়ের মাংসপেশি শক্তিশালী হয়।
জয়েন্টের ব্যথায় ঠান্ডা সেঁক দেবেন নাকি গরম সেঁক?
জয়েন্টে ব্যথা ও ফোলা খুব বেশি থাকলে ঠান্ডা সেঁক দিতে হবে। ব্যথা কিছুটা কমে সহনীয় হয়ে এলে গরম সেঁক এবং প্রয়োজনে রাতে হিটিং প্যাড ব্যবহার করা যেতে পারে।
এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।