গর্ভাবস্থা কোনো অসুখ নয়। তবে এ সময় শরীরের গঠন ও কাজে কিছু পরিবর্তন আসে, ফলে নতুন কিছু সমস্যা দেখা দেয় এবং পুরোনো সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। এই লেখায় মূলত গর্ভাবস্থায় হাত, পা, কাঁধ ও কোমরের ব্যথা এবং দুর্বলতা নিয়ে কথা বলা হয়েছে।
গর্ভাবস্থায় শরীরে সাধারণ পরিবর্তন
- আচরণে পরিবর্তন
- রক্তের পরিমাণ ও রক্তকণিকার সংখ্যা বাড়া
- বিপাকে পরিবর্তন
- ফুসফুসে কিছুটা চাপ পড়ে, তাই অল্প পরিশ্রমেই শ্বাস দ্রুত হয়
- হৃদযন্ত্র ও রক্তনালীতে পরিবর্তন
- কিডনি ও প্রস্রাবে পরিবর্তন
- দেহভঙ্গিতে পরিবর্তন
যেসব ব্যথা প্রায়ই দেখা যায়
- মেরুদণ্ডে ব্যথা
- নিতম্বে ব্যথা
- হাঁটু ও কোমরের জয়েন্টে ব্যথা
- পায়ের পাতা ও গোড়ালিতে ব্যথা
- হাতে ব্যথা
- কোনো জয়েন্টে সংক্রমণ
- হাড়ের ক্ষয় (অস্টিওপোরোসিস) থাকলে সারা শরীরে ব্যথা
কেন হয়
এর পেছনে কিছু হরমোনের হাত আছে: প্রোজেস্টেরন (Progesterone), ইস্ট্রোজেন (Oestrogen) ও রিলাক্সিন (Relaxin)। গর্ভাবস্থায় এগুলোর পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। এছাড়া গর্ভফুল থেকে কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিক বের হয়, যা সারা শরীরে ব্যথা, দুর্বলতা ও ক্ষুধামন্দার কারণ হতে পারে।
হাড়, জয়েন্ট ও মাংসপেশিতে কী বদল আসে
- ওজন বাড়ে: সাধারণত ৯ থেকে ১৪ কেজি, কখনো আরও বেশি। এতে শরীরের ওপর চাপ বাড়ে
- মেরুদণ্ডের বাঁক বদলায়: কোমরের দিকের বাঁক (Lumbar lordosis) বেড়ে যায়। শরীরের ভারকেন্দ্র সামনে ও ওপরে সরে আসে এবং ভারসাম্য নষ্ট হয়। ঘাড়ের বাঁকও বাড়ে
- লিগামেন্ট ও রগ ঢিলা হয়: রিলাক্সিন ও প্রোজেস্টেরন মাংসপেশি, লিগামেন্ট ও রগকে ঢিলা করে। ফলে জয়েন্ট নড়বড়ে হয়ে যায়। অনেকেই হাঁটতে গিয়ে হাঁটু, কোমর, নিতম্ব ও মেরুদণ্ডে জোর পান না, ব্যথা অনুভব করেন
- হাঁটু পেছনের দিকে অতিরিক্ত বেঁকে যেতে পারে
- হাঁটার ধরন বদলায়: শরীর সামলাতে পা দুটি ফাঁক করে হাঁটতে হয়। যত ফাঁক, হাঁটা তত অস্থির হয়
- সহজে ক্লান্ত হওয়া: অল্প পরিশ্রমেই ক্লান্তি আসে। জয়েন্টে ঘষা বাড়ে, তাই ব্যথা শুরু হয়
- স্নায়ুর সংকেতেও পরিবর্তন আসে: জয়েন্ট থেকে মস্তিষ্কে সংকেত যাওয়া কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়, তাতে হাঁটার সমন্বয়ে অসুবিধা হয়
পায়ের জয়েন্টে চাপ কখনো কখনো দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে। মেরুদণ্ডের হাড়েও বেশি চাপ পড়ে, এ কারণে সামান্য আঘাতেই মেরুদণ্ডের হাড়ের ক্ষতি হতে পারে।
এর কিছু পরিবর্তন সন্তানের স্বাভাবিক জন্মের জন্য সহায়ক হলেও চলাচলের সময় জয়েন্টগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় আর ব্যথা দেখা দেয়।
এ সময় নতুন করে ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় হাত, পা ও শরীর ফুলে যায়।
যা করা উচিত
- তিন কেজির বেশি ভারী কিছু মাটি থেকে তুলবেন না। তুলতেই হলে আগে হাঁটু মুড়ে বসুন, জিনিসটি শরীরের কাছে ধরে আস্তে আস্তে সোজা হয়ে দাঁড়ান। পিঠ সবসময় সোজা রাখুন, কোমর বা নিতম্ব বাঁকাবেন না
- কাজের ধরন ও পরিমাণ ঠিক করে নিন। যে কাজে কষ্ট হয়, তা এড়িয়ে চলুন
- মেরুদণ্ড, কোমর, নিতম্ব, হাঁটু ও পায়ের শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম অভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাছ থেকে শিখে নিয়মিত করুন
- বসা, শোয়া ও দাঁড়ানোর সঠিক নিয়ম জেনে মেনে চলুন
- নরম কুশনের জুতা পরুন
- যে কোনো কাতে শুয়ুন, দুই হাঁটুর মাঝখানে কোলবালিশ রাখুন। পর্যাপ্ত ঘুমান
- চিকিৎসকের পরামর্শমতো গরম বা ঠান্ডা সেঁক ও মালিশ করা যেতে পারে
- গর্ভাবস্থায় মেরুদণ্ড, কোমর ও নিতম্বের ব্যথা অনেক সময় গুরুতর সমস্যার সংকেত। তাই চিকিৎসকের সঙ্গে অবশ্যই যোগাযোগ করুন
যা করবেন না
- সামনে ঝুঁকে কাজ করবেন না
- ভারী কাজ এবং পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন কাজ এড়িয়ে চলুন
- মাছ, মাংস ও ডিম ভালো করে সিদ্ধ করে খান, আধাসিদ্ধ নয়
- সব খাবারই খান, তবে পরিমিত
- খুব দরকার না হলে এক্স-রে করবেন না। করতে হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন
- খুব দরকার না হলে ওষুধ খাবেন না। গর্ভাবস্থায় কোনো ওষুধই পুরোপুরি নিরাপদ নয়, ভিটামিনও না
- ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন
- ডিটারজেন্ট, কীটনাশক ও এসবের গন্ধ থেকে দূরে থাকুন
- ঝাঁকুনির পথ এড়িয়ে নিরাপদে ভ্রমণ করুন, সঠিক নিয়মে সিটবেল্ট বাঁধুন
- খুব গরম পানিতে গোসল করবেন না, মৃদু গরম পানি ব্যবহার করুন
প্রশ্ন ও উত্তর
গর্ভাবস্থায় কোনো ওষুধ খেতে পারি কি?
কোনো ওষুধই সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। খেতে হলে অনেক কিছু বিবেচনা করতে হয়। চিকিৎসকের সঙ্গে কথা না বলে কোনো ওষুধ খাবেন না, ভিটামিনও না।
সাধারণ কী কী ব্যায়াম করা যায়?
- হাত, পা ও মেরুদণ্ডের মাংসপেশি টান টান করার ব্যায়াম
- উরুর মাংসপেশির ব্যায়াম
- মেরুদণ্ডের ব্যায়াম
- নিতম্বের মাংসপেশি টান টান করার ব্যায়াম
- পায়ের পাতার ব্যায়াম
এগুলো অবশ্যই চিকিৎসকের কাছ থেকে শিখে নিয়ে অনুশীলন করতে হবে।
পিঠ ও মেরুদণ্ডের ব্যথায় কী করব?
- হাত ও পায়ের মাংসপেশি টান টান করার ব্যায়াম
- দাঁড়িয়ে কাজ করার সময় পালা করে একটি পা নিচু টুলের ওপর রাখা
- সাঁতার কাটা খুব ভালো ব্যায়াম
- হাঁটাহাঁটি করা
- কোমর দৃঢ় রাখতে সাপোর্ট বেল্ট (Lumbar corset) ব্যবহার করা
- নিতম্বের ব্যায়াম চিকিৎসকের পরামর্শে করা
- প্রচুর বিশ্রাম নেওয়া
নিতম্বের (Pelvis) ব্যথায় কী করব?
- দৌড়ানো এড়িয়ে চলুন
- হাঁটার সময় নিতম্বের সাপোর্ট বেল্ট ব্যবহার করুন
- শোয়ার নিয়ম মেনে চলুন
- যোগব্যায়াম, সাইকেল চালানো বা রোয়িং মেশিন ব্যবহার করতে পারেন
- নিতম্বের মাংসপেশি দৃঢ় করার ব্যায়াম শিখে নিয়মিত করুন
পায়ের মাংসপেশিতে প্রায়ই খিঁচুনি (ক্র্যাম্প) হয়। কী করব?
- চিকিৎসকের পরামর্শমতো পায়ের মাংসপেশি টান টান করার ব্যায়াম করুন
- ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের অভাবে এমন হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শে মিনারেল ট্যাবলেট খান
- খুব বেশি হলে ব্রেস (Brace) ব্যবহার করতে হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। গর্ভাবস্থায় যে কোনো ব্যথা বা ওষুধের বিষয়ে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
গর্ভাবস্থায় কোমর, হাঁটু ও জয়েন্টে ব্যথা হওয়ার মূল কারণ কী?
গর্ভাবস্থায় প্রোজেস্টেরন, ইস্ট্রোজেন ও রিলাক্সিন হরমোন বেড়ে মাংসপেশি, রগ ও লিগামেন্ট ঢিলা হয়ে জয়েন্ট নড়বড়ে হয়ে যায়। পাশাপাশি ৯ থেকে ১৪ কেজি বা তার বেশি ওজন বাড়া এবং কোমরের দিকের মেরুদণ্ডের বাঁক বেড়ে যাওয়ায় জয়েন্টে অতিরিক্ত চাপ পড়ে ব্যথা হয়।
গর্ভাবস্থায় ব্যথার জন্য নিজে থেকে কোনো ওষুধ বা ভিটামিন খাওয়া যাবে কি?
না, গর্ভাবস্থায় কোনো ওষুধই সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়, এমনকি ভিটামিনও নয়। তাই চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা না করে কোনো ব্যথার ওষুধ বা ভিটামিন খাওয়া উচিত নয়।
গর্ভাবস্থায় পায়ের মাংসপেশিতে প্রায়ই খিঁচুনি বা ক্র্যাম্প হলে কী করণীয়?
ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের অভাবে এমন হতে পারে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শে মিনারেল ট্যাবলেট খাওয়া যেতে পারে। এছাড়া চিকিৎসকের কাছ থেকে শিখে পায়ের মাংসপেশি টান টান করার ব্যায়াম করা উচিত।
এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।