গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes) হলো গর্ভাবস্থায় রক্তে সুগার স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যাওয়া। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সন্তান জন্মের পর সুগার আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়।
গর্ভাবস্থার যে কোনো সময় এটি হতে পারে, তবে সাধারণত শেষ পাঁচ মাসেই বেশি দেখা যায়।
কেন হয়
- গর্ভাবস্থায় শরীরে বাড়তি ইনসুলিন লাগে। মায়ের শরীর সেই বাড়তি ইনসুলিন তৈরি করতে না পারলে ডায়াবেটিস হয়
- গর্ভফুল (Placenta) থেকে কিছু হরমোন বের হয়, যা শরীরের স্বাভাবিক ইনসুলিনের কাজে বাধা দেয়
এটা কি পরে ভালো হয়ে যায়
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হ্যাঁ। সন্তান জন্মের পরপরই মায়ের রক্তে সুগার স্বাভাবিক হয়ে যায়। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হয় এবং পরে টাইপ ২ ডায়াবেটিস থেকে যায়। তাই সন্তান জন্মের পরও চিকিৎসকের পরামর্শমতো নিয়মিত সুগার পরীক্ষা করানো জরুরি।
কাদের ঝুঁকি বেশি
- নিজের ওজন বেশি হলে
- আগের সন্তান জন্মের সময় তার ওজন সাড়ে চার কেজির বেশি ছিল
- আগের গর্ভাবস্থায়ও ডায়াবেটিস হয়েছিল
- বাবা বা মায়ের ডায়াবেটিস থাকলে
- ভাই বা বোনের ডায়াবেটিস থাকলে
- বয়স ২৫ এর বেশি হলে
- এশীয় বংশোদ্ভূতদের মধ্যে ঝুঁকি বেশি
লক্ষণ
সাধারণত কোনো লক্ষণই থাকে না। রোগী নিজেও বুঝতে পারেন না। গর্ভাবস্থার নিয়মিত পরীক্ষায় রক্ত দেখতে গিয়ে সাধারণত ধরা পড়ে। সুগার অনেক বেশি হলে এসব দেখা দিতে পারে:
- অতিরিক্ত পিপাসা
- বারবার মুখ শুকিয়ে যাওয়া
- বারবার খেয়েও ক্ষুধা না কমা
- খুব দুর্বলতা ও অবসাদ
- বারবার প্রস্রাব হওয়া
কী ক্ষতি হতে পারে
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস মা ও পেটের সন্তান দুজনের জন্যই ক্ষতিকর।
- সন্তান স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বড় হয়, সাড়ে চার কেজির বেশি, ফলে প্রসবে অসুবিধা হয়
- জরায়ুতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পানি জমতে পারে, তাতে সময়ের আগেই প্রসব হয়ে যেতে পারে
- অপরিণত সন্তানের শ্বাসকষ্ট হতে পারে
- মায়ের উচ্চ রক্তচাপ এবং প্রি এক্লাম্পসিয়া বা এক্লাম্পসিয়ার মতো জটিলতা হতে পারে
- জন্মের পর সন্তানের রক্তে গ্লুকোজ কমে গিয়ে মারাত্মক খিঁচুনি হতে পারে
- মৃত সন্তান জন্ম নেওয়ার ঝুঁকি থাকে। জন্মের পরপর বা পেটে থাকা অবস্থায় সন্তানের মৃত্যুও হতে পারে
- মায়ের স্থায়ীভাবে টাইপ ২ ডায়াবেটিস হতে পারে
- পরের গর্ভাবস্থায়ও ডায়াবেটিস হতে পারে
- এমন মায়ের সন্তানের পরবর্তী জীবনে স্থূলতা ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা অনেক বেশি
প্রতিরোধ
সবসময় প্রতিরোধ করা যায় না, তবে নিচের নিয়মগুলো মানলে অনেক উপকার হয়।
সুষম খাবার
খাবারের স্বাদের চেয়ে পুষ্টিকে গুরুত্ব দিন। ফল, সবুজ শাকসবজি ও পূর্ণ শস্য (লাল চাল, লাল আটা) খান।
নিয়মিত শরীরচর্চা
- হাঁটাহাঁটি
- সাঁতার
- সাইকেল চালানো
- সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা
- বাসে গেলে এক স্টপ আগে নেমে বাকিটা হেঁটে যাওয়া
- গাড়ি দূরে রেখে বাকি পথ হেঁটে যাওয়া
সন্তান নেওয়ার আগেই ওজন স্বাভাবিক করুন
বাড়তি ওজন থাকলে সন্তান নেওয়ার আগেই কমিয়ে ফেলুন। শরীরের ওজন স্বাভাবিক রাখলে:
- হার্ট ভালো থাকে
- কাজ করার শক্তি বাড়ে
- আত্মবিশ্বাস বাড়ে
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। গর্ভাবস্থায় রক্তের সুগার পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যাপারে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সন্তান জন্মের পর কি গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ভালো হয়ে যায়?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সন্তান জন্মের পরপর মায়ের রক্তে সুগার আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে পরে টাইপ ২ ডায়াবেটিস থেকে যেতে পারে, তাই প্রসবের পরও চিকিৎসকের পরামর্শমতো নিয়মিত সুগার পরীক্ষা করানো জরুরি।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের সাধারণ লক্ষণগুলো কী কী?
সাধারণত এর কোনো স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না এবং গর্ভাবস্থার নিয়মিত রক্ত পরীক্ষায় এটি ধরা পড়ে। তবে রক্তে সুগার অনেক বেড়ে গেলে অতিরিক্ত পিপাসা, বারবার মুখ শুকিয়ে যাওয়া, ক্ষুধা না কমা, প্রচণ্ড দুর্বলতা ও ঘনঘন প্রস্রাব হতে পারে।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হলে মা ও শিশুর কী ধরনের ঝুঁকি থাকে?
মায়ের উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-এক্লাম্পসিয়া এবং ভবিষ্যতে স্থায়ী টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আর সন্তানের ওজন সাড়ে চার কেজির বেশি হয়ে প্রসবে জটিলতা, সময়ের আগে প্রসব, শ্বাসকষ্ট বা জন্মের পর রক্তে গ্লুকোজ কমে খিঁচুনি হতে পারে।
এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।