মেনোপজ কী
মাসিক বা ঋতুস্রাব যখন স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়, অর্থাৎ টানা ১২ মাস বা তার বেশি সময় বন্ধ থাকে, তখন তাকে মেনোপজ (Menopause) বলে। এর মানে নারীর সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা শেষ হয়ে যাওয়া। এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, শরীরে ইস্ট্রোজেন (Oestrogen) নামের হরমোনের উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তবে ব্যাপারটা সবসময় এত সরল নয়।
মেনোপজের গড় বয়স ৫১ বছর। অঞ্চলভেদে কিছুটা তারতম্য হয়।
একটা কথা মনে রাখা জরুরি: মেনোপজ কোনো অসুখ নয়। এটি জীবনের একটি স্বাভাবিক অধ্যায়। দীর্ঘ জীবন পাওয়ার আনন্দের পাশে কিছু শারীরিক অসুবিধা ভোগ করা, এই আর কী।
ইস্ট্রোজেন কী করে
ইস্ট্রোজেন নারীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নারী হিসেবে গড়ে তোলে এবং সুরক্ষা দেয়। নারী ও পুরুষের মধ্যে আকৃতি, স্বভাব ও গুণগত যেসব পার্থক্য আছে, তার বেশিরভাগের পেছনে এই হরমোন। তাই একে স্ত্রী হরমোনও বলা হয়। এর কাজ নারীর শরীরের প্রায় প্রতিটি কোষেই ছড়িয়ে আছে।
- স্তন, নিতম্ব, চামড়া ও শরীরের চুল নারীসুলভ রাখে
- মাসিক নিয়ন্ত্রণ করে
- জরায়ু ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত অঙ্গের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটায়
নয় বছর বয়স থেকেই শরীরে এই হরমোন তৈরি শুরু হয় এবং মাসিক বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত স্বাভাবিক থাকে। এরপর ধীরে ধীরে কমতে থাকে, আর তখনই মেনোপজের লক্ষণ দেখা দেয়।
হাড়ের ওপর ইস্ট্রোজেনের কাজ: আমাদের হাড় প্রতিনিয়ত ক্ষয় হয় আবার মেরামত হয়। ইস্ট্রোজেন এই মেরামতে সাহায্য করে, ফলে হাড়ের ক্ষয় ঠেকে এবং হাড় শক্ত থাকে। ইস্ট্রোজেন না থাকলে হাড় ভঙ্গুর হয়ে যায়।
ইস্ট্রোজেন বেশি হলে? শরীরে ইস্ট্রোজেন অতিরিক্ত বেড়ে গেলেও ক্ষতি হতে পারে, যেমন ব্রণ, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং স্তন ক্যান্সার।
ইস্ট্রোজেন কমলে? শরীরের সব কোষই প্রভাবিত হয়: দেহ, মন, আবেগ ও যৌন স্বাস্থ্য সবকিছুই। হৃদরোগ ও হাড়ের ক্ষয় বাড়ে এবং ওজন অনেক বেড়ে যেতে পারে, কারণ ইস্ট্রোজেন শরীরের বিপাক ও ওজন নিয়ন্ত্রণ করে।
খাবারে কি ইস্ট্রোজেন ঠিক রাখা যায়? কিছু খাবার ইস্ট্রোজেনের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে: তাজা ও শুকনো ফল, সব ধরনের বাদাম (চিনাবাদাম, কাঠবাদাম, আখরোট), রসুন, তিসি ও তিলের মতো বীজ এবং সয়াজাত খাবার।
মেনোপজের লক্ষণ
- হঠাৎ মুখ লাল ও গরম হয়ে যাওয়া, গরম ভাব সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া
- রাতে ঘাম হওয়া, পরে ঠান্ডা লাগা
- ঘুমের ব্যাঘাত
- যৌন আগ্রহ কমে যাওয়া
- হাঁটু, কোমর ও নিতম্বে ব্যথা
- কখনো কখনো সারা শরীরে ব্যথা। সাধারণ ব্যথার ওষুধে এই ব্যথা না-ও কমতে পারে
লক্ষণগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে থেকে যায়, তবে ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে যায়। পনেরো থেকে বিশ শতাংশ ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে কমেও আসে।
হাড়, জয়েন্ট ও মাংসপেশিতে কী বদল আসে
ত্রিশ বছর বয়সের পর থেকেই হাড়, জয়েন্ট ও মাংসপেশিতে নানা পরিবর্তন শুরু হয়। মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেনের সুরক্ষা কমে যাওয়ায় এই পরিবর্তন আরও বেশি মাত্রায় দেখা দেয়।
- হাড়ের ঘনত্ব কমে যায় (অস্টিওপোরোসিস): হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়, তাই সহজে ভেঙে যেতে পারে
- কার্টিলেজ পাতলা হয়: হাড়ে হাড়ে ঘষা লাগে এবং জয়েন্ট নষ্ট হয় (অস্টিওআর্থ্রাইটিস)
- রগ ও লিগামেন্ট দুর্বল হয়: জয়েন্টের শক্তি কমে এবং জয়েন্ট ধীরে ধীরে শক্ত হতে থাকে
- মাংসপেশি কমে যায় (সারকোপেনিয়া): মাংসপেশির আকার ছোট হয়, সংকোচন ও প্রসারণের শক্তি কমে এবং চলাচল ধীর হয়ে পড়ে
হাঁটুর আশপাশের মাংসপেশি দুর্বল হলে হাঁটু ক্রমে দুর্বল হয়ে অস্টিওআর্থ্রাইটিস শুরু হয় এবং ব্যথা দেখা দেয়। পুরো ব্যাপারটিকেই বলা হয় মেনোপজজনিত জয়েন্টের ব্যথা।
প্রতিরোধের উপায়
সচল থাকুন, নিজের কাজ নিজে করুন
- নিজের কাপড় নিজে ধোয়া, শুকাতে দেওয়া, ঘরে আনা। ইস্ত্রি নিজে করা বা ইস্ত্রির দোকানে হেঁটে গিয়ে দিয়ে আসা এবং নিয়ে আসা
- নিজের খাবার নিজে রান্না করা, সবজি নিজে কাটা ও বাছা। নিজে হেঁটে গিয়ে বাজার করে আনতে পারলে আরও ভালো
- এগুলো সবই খুব ভালো ব্যায়াম। যত নিজে সচল থাকবেন, তত ভালো থাকবেন
- একটানা এক ঘণ্টার বেশি বসে থাকবেন না। কাজ না থাকলেও উঠে দুই থেকে তিন মিনিট হাঁটুন
- প্রতিদিন নিয়ম করে হাঁটুন (জগিং বা দৌড় নয়)
- তিন তলা পর্যন্ত হেঁটে ওঠানামা উপকারী, অন্য কোনো অসুবিধা না থাকলে
- সাঁতার ভালো ব্যায়াম। তবে সাঁতারের সঙ্গে হাঁটাও চাই
- ওজন স্বাভাবিকের কাছাকাছি রাখুন
- ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
- হাঁটুন, হাঁটুন, হাঁটুন। নিজে নিজে হাঁটুন। দরকার হলে লাঠি বা ওয়াকার নিন
খাওয়াদাওয়া
কী খাচ্ছেন, সেটার মতোই গুরুত্বপূর্ণ কখন খাচ্ছেন। নির্দিষ্ট সময় মেনে খান। কোনো বেলার খাবার কোনোভাবেই বাদ দেবেন না। ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ে তেমন কোনো উপকার নেই, বরং ক্ষতি হতে পারে।
কী খাবেন
- মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, দই, মাখন, পনির। প্রতিদিন সব খাওয়ার দরকার নেই, যে কোনো একটি বা দুটি হলেই চলে। চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
- প্রচুর পানি। মেনোপজের সময় প্রায়ই মুখ শুকিয়ে যায়, দিনে ৮ থেকে ১২ গ্লাস পানি পান করুন
- ভিটামিন ডি, ক্যালসিয়াম ও একটি মাল্টিভিটামিন (চিকিৎসকের পরামর্শমতো)
- প্রচুর শাকসবজি, সবুজ ও রঙিন দুটোই
- প্রতিদিন একটি ফল। ডায়াবেটিস থাকলে বড় ফলের অর্ধেক
- অল্প পরিমাণে ফাইটোইস্ট্রোজেনসমৃদ্ধ খাবার: তিল, তিসি, সবুজ শাকসবজি, আমলকি, পেয়ারা, কুল ও অন্যান্য টক ফল, গাজর এবং সব ধরনের বাদাম
কী এড়াবেন
- কফি (দিনে এক কাপ চলতে পারে, বেশি নয়)
- বেশি চিনি বা লবণের খাবার
- মশলাদার খাবার
- প্রতি বেলায় মাংস। বরং মাছ খান, ছোট মাছ কাঁটাসহ খেতে পারলে আরও ভালো
- বেশি তেলতেলে খাবার
- কৌটাজাত প্রক্রিয়াজাত খাবার
- সব ধরনের কোমল পানীয়
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
মেনোপজ রোগ নয়, জীবনের নতুন অধ্যায়। তবে লক্ষণ শুরু হলে লক্ষণ অনুযায়ী উপযুক্ত চিকিৎসক বেছে নিয়ে পরামর্শ নিন। খাবারের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বা পারিবারিক চিকিৎসকের উপদেশ নিন। ধীরে ধীরে সবই সয়ে যাবে।
মাংসপেশি, হাড় ও জয়েন্টে ব্যথা হলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। হাড়ের অবস্থা জানতে কিছু পরীক্ষা লাগবে।
ওষুধ
চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে খেতে পারেন:
- সাধারণ ব্যথানাশক
- ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়াম
- মাল্টিভিটামিন
- অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধের ওষুধ
- মেনোপজের লক্ষণ খুব বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ
ঘুমের ওষুধ না খাওয়াই ভালো।
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। নিজের জন্য কোন খাবার ও ওষুধ উপযুক্ত, তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মেনোপজ বলতে ঠিক কী বোঝায়?
মাসিক বা ঋতুস্রাব টানা ১২ মাস বা তার বেশি সময় স্থায়ীভাবে বন্ধ থাকলে তাকে মেনোপজ বলে। এটি কোনো অসুখ নয়, বরং জীবনের একটি স্বাভাবিক অধ্যায়, যার গড় বয়স ৫১ বছর। এ সময় শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
মেনোপজের সময় হাড় ও জয়েন্টে কী ধরনের পরিবর্তন আসে?
ইস্ট্রোজেনের সুরক্ষা কমে যাওয়ায় হাড়ের ঘনত্ব কমে হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে (অস্টিওপোরোসিস) এবং কার্টিলেজ পাতলা হয়ে অস্টিওআর্থ্রাইটিস দেখা দেয়। পাশাপাশি রগ, লিগামেন্ট ও মাংসপেশি দুর্বল হয়ে হাঁটু, কোমর ও নিতম্বে ব্যথা শুরু হয়।
মেনোপজে হাড় ও জয়েন্ট ভালো রাখতে কী ধরনের ব্যায়াম ও খাদ্যাভ্যাস জরুরি?
নিজের দৈনন্দিন কাজ নিজে করা এবং প্রতিদিন নিয়ম করে হাঁটা খুব উপকারী, তবে দৌড়ানো বা জগিং করা উচিত নয়। নির্দিষ্ট সময়ে সুষম খাবার, প্রচুর শাকসবজি ও দিনে ৮ থেকে ১২ গ্লাস পানি খেতে হবে, আর ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা কোনো বেলার খাবার বাদ দেওয়া যাবে না।
এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।