অস্টিওপোরোসিস (Osteoporosis) হাড়ের ক্ষয়রোগ। এতে হাড়ের পরিমাণ কমে যায় এবং হাড় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। সামান্য হাঁচি, কাশি বা অল্প আঘাতেই হাড় ভেঙে যেতে পারে। অনেক সময় বড় কোনো আঘাত ছাড়াই হাড় ভাঙে, কিংবা কোনো হাড়ে বা মেরুদণ্ডে ব্যথা শুরু হয়।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, পঞ্চাশ বছরের বেশি বয়সী প্রতি দুজন নারীর একজন এবং প্রতি চারজন পুরুষের একজনের হাড় ভাঙে এই রোগের কারণে।
হাড়ের গঠন
হাড়ের প্রায় ৭০ ভাগ খনিজ পদার্থ, বাকি ৩০ ভাগ আমিষ, পানি ও অন্য কিছু উপাদান। খনিজ পদার্থ হলো ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম, ফ্লোরাইড, জিংক ইত্যাদি। রান্নায় সাধারণত খনিজ পদার্থ এবং ভিটামিন ডি নষ্ট হয় না, বড়জোর ১০ শতাংশ নষ্ট হতে পারে।
মূল কারণ
- অপুষ্টি, সুষম খাবারের অভাব
- বয়স বাড়া
- নারী হওয়া (প্রধানত হরমোনের কারণে)
- ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, কিছু খনিজ ও কিছু হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া
- জীবনযাপনের ধরন
- কিছু ওষুধ দীর্ঘদিন খাওয়া
- শরীরের কিছু রোগ
কেন এটি মারাত্মক
এর প্রধান জটিলতা হলো বাইরে থেকে কোনো কারণ ছাড়াই হাড় ভেঙে যাওয়া। সবচেয়ে বেশি ভাঙে মেরুদণ্ডের হাড়, তারপর কোমরের ও পায়ের হাড়। হাড় ভেঙে চলাফেরার ক্ষমতা হারালে মানুষ প্রায় জড়বস্তুর মতো হয়ে যায়। চলাফেরা না করায় শরীরের অন্য অঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে, জীবনের মান নেমে যায় এবং খুব দ্রুত জীবনের অবসানও ঘটতে পারে।
সূর্যের আলো ও ভিটামিন ডি
খাবারে যত ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসই খান, ভিটামিন ডি ছাড়া সেগুলো খাদ্যনালী থেকে রক্তে ঢুকবে না। ভিটামিন ডি অনেক খাবারে আছে, কিন্তু সবচেয়ে ভালো ভিটামিন ডি তৈরি হয় আমাদের চামড়াতেই, সরাসরি সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি গায়ে লাগলে।
কী করবেন
- দশ থেকে পনেরো মিনিট শরীরের যতটা সম্ভব অংশ খোলা রেখে সরাসরি রোদ লাগান
- আমাদের দেশে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সময়টা সবচেয়ে ভালো
- এ সময় সানস্ক্রিন বা সাধারণ তেলও লাগাবেন না
- সপ্তাহে অন্তত দুইবার
সুস্থ হাড়ের জন্য জরুরি ভিটামিন ও খনিজ
ক্যালসিয়াম আর আমিষ মিলে হাড়ের প্রায় ৯০ ভাগ তৈরি করে। এছাড়া দরকার ভিটামিন ডি, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন সি, ভিটামিন কে এবং জিংক।
কোথায় পাবেন
- ক্যালসিয়াম: দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার (দই, পনির, ঘি, মাখন), সবুজ শাকসবজি, বাঁধাকপি, ঢেঁড়স, লেটুস পাতা, লাল শাক, সিম, বরবটি, সয়াবিন, বিভিন্ন বীজ, মাছ, মাংস, ডিম, বাদাম
- ভিটামিন ডি: সূর্যের আলো, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, কলিজা
- ম্যাগনেসিয়াম: লাল চাল, বিভিন্ন বীজ, সিম, বাদাম
- ভিটামিন কে: গ্রিন টি, সবুজ শাকসবজি, বিভিন্ন বীজ
- জিংক: কলিজা, মাছ, মাংস, অঙ্কুরিত ছোলা
হাড় ভালো রাখতে কী দরকার
- সবসময় কর্মচঞ্চল থাকুন, অলসভাবে শুয়ে বসে থাকবেন না
- সুষম খাবার খান
- ধূমপান, কফি ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন
- ওজন স্বাভাবিক রাখুন
- নারীরা বিশেষ সাবধান থাকুন, বিশেষ করে মাসিক বন্ধ হওয়ার পর
- ডায়াবেটিস থাকলে নিয়ন্ত্রণে রাখুন
- পরিবারে কারও আপনা আপনি হাড় ভাঙার ঘটনা থাকলে আরও মনোযোগী হোন
লক্ষণ
- মেরুদণ্ডে ব্যথা, হাঁটলে ব্যথা বাড়া, সাধারণ ব্যথার ওষুধেও না কমা
- সারা শরীরে ব্যথা
- শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে যাওয়া (Kyphosis)
- উচ্চতা কমে যাওয়া
- কোনো কারণ ছাড়া বা অল্প আঘাতেই হাড় ভাঙা। সবচেয়ে সহজে ভাঙে মেরুদণ্ডের হাড়, কোমরের হাড়, কব্জির হাড় ও পায়ের যে কোনো হাড়
- নারীদের ক্ষেত্রে লক্ষণ প্রায়ই মাসিক বন্ধ হওয়ার ঠিক পরে বা কিছু আগে থেকে শুরু হয়
রোগ আছে কি না, নিশ্চিত হবেন কীভাবে? লক্ষণ থাকলে ডাক্তারের কাছে যান। সাধারণ এক্সরে করে নিশ্চিত হওয়া যায় না। চিকিৎসকের পরামর্শমতো হাড়ের খনিজ ঘনত্বের (Bone Density) বিশেষ পরীক্ষা করতে হবে।
কী খাবেন
- দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, যেমন ছানা, পনির, দই, মাখন, ঘি। সবই পরিমিত এবং চিকিৎসকের পরামর্শে
- সবুজ শাকসবজি, সঠিকভাবে রান্না করে
- আমিষসমৃদ্ধ খাবার: মাছ, মাংস, ডিম। সাধারণভাবে প্রতি কেজি ওজনের জন্য প্রতিদিন কমপক্ষে এক গ্রাম আমিষ, বয়স্কদের জন্য দেড় গ্রাম
- আমরা সবসময় সুষম খাবার পাই না, তাই চিকিৎসকের পরামর্শে একটি মাল্টিভিটামিন ও মিনারেল ট্যাবলেটও খেতে পারেন। শুধু ক্যালসিয়াম আর ভিটামিন ডি বড়ি খেলে চলবে না
ক্যালসিয়াম ভাগ করে খান: প্রতি বেলার খাবারের সঙ্গেই ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। সারাদিনের চাহিদা এক বেলায় সারলে চলবে না, কারণ খাদ্যনালী থেকে একবারে ৫০০ মিলিগ্রামের বেশি ক্যালসিয়াম শোষিত হয় না। বাকিটা মলের সঙ্গে বেরিয়ে যায়।
কী এড়াবেন
কিছু খাবার ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য খনিজ শোষণে বাধা দেয়:
- ফাইটিক অ্যাসিড: খামির বা বেকিং পাউডার ছাড়া সাধারণ চাপাতি বা রুটি, কাঁচা সিমের বীজ এবং আরও অনেক কাঁচা বীজজাতীয় খাবার
- অক্সালিক অ্যাসিড: পুঁইশাক ও পালংশাক
- সোডিয়াম: বেশি লবণের খাবার। যত বেশি লবণ খাবেন, তত বেশি ক্যালসিয়াম আলাদা করে লাগবে
কোন ওষুধ দীর্ঘদিন খেলে অস্টিওপোরোসিস হতে পারে
- অ্যালুমিনিয়ামযুক্ত অ্যান্টাসিড
- পাকস্থলীর অ্যাসিড কমানোর ওষুধ (PPI)
- খিঁচুনির ওষুধ (যেমন ডাইল্যান্টিন, ফেনোবারবিটাল)
- অ্যারোমাটেজ ইনহিবিটর (যেমন অ্যারিমিডেক্স, অ্যারোমাসিন)
- ক্যান্সারের প্রায় সব ওষুধ
- জন্মনিরোধক বড়ি
- মেথোট্রেক্সেট
- কিছু বিষণ্নতার ওষুধ (SSRI)
- স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ বেশিদিন খাওয়া (দৈনিক ৫ মিগ্রার বেশি, তিন মাসের বেশি)
কোন কোন রোগে ঝুঁকি বাড়ে
- রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ও প্রদাহজনিত আরও কিছু রোগ
- বারবার বদহজম ও ডায়রিয়া (IBS)
- স্তন ক্যান্সার, প্রোস্টেট ক্যান্সার, রক্তের ক্যান্সারসহ কিছু ক্যান্সার
- ডায়াবেটিস (নিয়ন্ত্রণে থাকলে ঝুঁকি কম)
- থাইরয়েড ও অন্যান্য হরমোনের অসুখ
- অনিয়মিত মাসিক, তুলনামূলক অল্প বয়সে মাসিক বন্ধ হওয়া
- কিডনি ও লিভারের রোগ
- সুষম খাবারের অভাব ও অপুষ্টি
- খুব হালকা পাতলা শরীর
প্রতিরোধের উপায়
- সঠিক খাবার খান
- কোমল পানীয়, কোলা, অ্যালকোহল ও ধূমপান এড়িয়ে চলুন
- অতিরিক্ত কফি ও অতিরিক্ত আমিষ বাদ দিন
- দীর্ঘদিন অ্যান্টাসিড জাতীয় ওষুধ খাবেন না (ছয় থেকে আট সপ্তাহের বেশি নয়)
- নিয়ম মেনে সরাসরি সূর্যের আলো নিন
- নারীরা কিছু হরমোন পরীক্ষা করিয়ে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন
- চল্লিশ বছরের বেশি বয়সী সবাই অন্তত একবার হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা করান
- চিকিৎসকের পরামর্শে প্রতিরোধমূলক ওষুধ খেতে পারেন
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
অস্টিওপোরোসিস একটি নীরব ঘাতক। লক্ষণ অনেক সময় স্পষ্ট থাকে না, তাই কোনো একটি হাড় না ভাঙা পর্যন্ত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগ ধরাই পড়ে না। শুরুতে ধরা পড়লে অনেক জটিলতা থেকে বাঁচা যায়। তাই নিচের কোনোটি প্রযোজ্য হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন:
- বয়স পঞ্চাশের বেশি (নারী বা পুরুষ উভয়েই)
- নারীদের মাসিক বন্ধ হওয়ার পথে
- খুব হালকা পাতলা শরীর
- পরিবারে কারও আপনা আপনি হাড় ভাঙার ঘটনা
- ওপরে বলা ওষুধ খাওয়া
- ওপরে বলা রোগ থাকা
- সাধারণ আঘাতে বা কোনো কারণ ছাড়া কোনো হাড় ভাঙলে
অস্টিওপোরোসিসে ব্যায়াম
নিয়মিত যথাযথ ব্যায়াম করলে হাড় আরও মজবুত হয় এবং রোগ প্রতিরোধ করা যায়। সব ধরনের ব্যায়ামই চিকিৎসকের পরামর্শমতো করুন।
১. দাঁড়িয়ে করা ব্যায়াম (পা শরীরের ওজন বহন করে)
- হাঁটাহাঁটি
- দীর্ঘপথ হাঁটা (হাইকিং)
- নাচ
- দড়ি লাফ
- তিন তলা পর্যন্ত সিঁড়ি ভাঙা, অন্য কোনো অসুবিধা না থাকলে
সাইকেল চালানো ও সাঁতার ভালো ব্যায়াম, কিন্তু শরীরের ওজন বহন করে করা হয় না বলে অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে তত কার্যকর নয়। তাই সাঁতারের সঙ্গে হাঁটাও চাই।
কতটা হাঁটবেন? সপ্তাহে কমপক্ষে তিন থেকে পাঁচ মাইল।
২. বাধার বিরুদ্ধে ব্যায়াম (Resistance Exercise)
- হাতে স্প্রিং বা ইলাস্টিক নিয়ে ব্যায়াম
- হাতে ওজন নিয়ে ব্যায়াম
- পায়ে ওজন ঠেলা বা ইলাস্টিক নিয়ে ব্যায়াম
- তিন তলা পর্যন্ত ওঠানামা
খালি হাতে ব্যায়ামের চেয়ে বাধার বিরুদ্ধে ব্যায়াম ভালো।
৩. মাংসপেশি টান টান করার ব্যায়াম (Stretching) ও যোগব্যায়াম
সতর্কতা: অস্টিওপোরোসিস থাকলে দৌড়ানো, লাফানো ও জগিং করা উচিত নয়। এতে মেরুদণ্ডের হাড়ে ফাটল দেখা দিতে পারে, আর তাতে কোমরে ব্যথা হবে। সাধারণ হাঁটাহাঁটি, বাধার বিরুদ্ধে ব্যায়াম, নাচ ও বাগান করাই যথেষ্ট।
কি পুরোপুরি সেরে যায়?
সাধারণত না। তবে বাজারে অনেক ধরনের ওষুধ আছে। নিয়মিত ওষুধ খেলে এবং জীবনযাপনে কিছু বদল আনলে হাড় ভাঙার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে:
- যথাযথ খাবার
- স্ট্রেচিং ব্যায়াম
- চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ
হাড়ের জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার কোন ভিটামিন? ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়াম একসঙ্গে। শুধু ভিটামিন ডি বা শুধু ক্যালসিয়ামে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও মিলতে পারে। সঙ্গে অন্যান্য খনিজ পদার্থও নিতে হবে।
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যাপারে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
শরীরে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি তৈরির জন্য কখন ও কীভাবে রোদ লাগানো উচিত?
আমাদের দেশে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে সপ্তাহে অন্তত দুইবার ১০ থেকে ১৫ মিনিট সরাসরি শরীরে রোদ লাগানো সবচেয়ে ভালো। এ সময় শরীরে সানস্ক্রিন বা সাধারণ তেল লাগানো যাবে না এবং যতটা সম্ভব অংশ খোলা রাখতে হবে।
সারাদিনের ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার এক বেলায় না খেয়ে ভাগ করে খাওয়া জরুরি কেন?
আমাদের খাদ্যনালী থেকে একবারে ৫০০ মিলিগ্রামের বেশি ক্যালসিয়াম শোষিত হতে পারে না এবং বাড়তি অংশ মলের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। তাই এক বেলায় সব না খেয়ে প্রতি বেলার খাবারের সঙ্গেই ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার রাখা উচিত।
অস্টিওপোরোসিস থাকলে কোন ধরনের ব্যায়াম এড়িয়ে চলা উচিত?
অস্টিওপোরোসিস থাকলে দৌড়ানো, লাফানো ও জগিং করা উচিত নয়, কারণ এতে মেরুদণ্ডের হাড়ে ফাটল ধরে কোমরে ব্যথা হতে পারে। এর বদলে চিকিৎসকের পরামর্শমতো সাধারণ হাঁটাহাঁটি, বাধার বিরুদ্ধে ব্যায়াম, নাচ বা বাগান করাই যথেষ্ট।
এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।