সাধারণ স্বাস্থ্য

ওজন কমানোর সহজ কৌশল: মোটা হওয়ার কারণ, খাবার ও অভ্যাস

শরীরের স্বাভাবিক ওজন সবার জন্য এক নয়। বয়স, লিঙ্গ ও উচ্চতা অনুযায়ী তা ভিন্ন হয়। এর জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি চার্ট আছে। আপনার ওজন সেই চার্টের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি হলে তাকে বলে মাত্রাতিরিক্ত ওজন (Overweight)। ২০ শতাংশের বেশি হলে বলে মাত্রাতিরিক্ত মোটা (Obese)।

ওজন বাড়ানো সহজ, কিন্তু একবার বেড়ে গেলে কমানো সহজ নয়। বাড়ার কারণ অনেক। কারণগুলো না বুঝেই অনেকে আপনাকে উপদেশ দিতে মুখিয়ে থাকবেন, যদিও সেসব উপদেশের বেশিরভাগই বিজ্ঞানভিত্তিক নয়।

বিএমআই (BMI) দিয়ে হিসাব

বিএমআই (Body Mass Index) বের করা হয় ওজন (কেজি) ভাগ উচ্চতার (মিটার) বর্গ দিয়ে। যে সংখ্যা আসবে, সেটি এভাবে পড়ুন:

  • ১৮.৫ এর নিচে: কম ওজন (Underweight)
  • ১৮.৫ থেকে ২৪.৯: স্বাভাবিক ওজন
  • ২৫ থেকে ২৯.৯: মাত্রাতিরিক্ত ওজন
  • ৩০ এর ওপরে: মাত্রাতিরিক্ত মোটা
  • ৪০ এর ওপরে: বিপজ্জনকভাবে মোটা

ওজন বাড়ার সাধারণ কারণ

  • জন্মগত: বাবা মা দুজনের একজন মোটা হলে সন্তানের মোটা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি
  • প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার খাওয়া
  • বেশি শর্করাজাতীয় খাবার, যেমন ভাত ও মিষ্টি
  • কম বার খাওয়া। যত কম বার খাবেন, মোটা হওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়ে। তাই একবারে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে কয়েকবার খাওয়া ভালো অভ্যাস
  • শারীরিক পরিশ্রম না করা
  • শিশুকালে অতিরিক্ত ওজন
  • কিছু ওষুধ: বিষণ্নতার ওষুধ (Antidepressant), কার্বামাজেপিন, ডায়াবেটিসের অনেক ওষুধ, জন্মনিরোধক বড়ি, উচ্চ রক্তচাপের কিছু ওষুধ ও অ্যান্টিহিস্টামিন
  • কিছু মানসিক অবস্থা: সবসময় একঘেয়েমি বা ক্লান্তি, সবসময় বিষণ্নতা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, সবসময় রাগ
  • থাইরয়েডের অসুখ
  • ঘুমের ব্যাঘাত। ঘুম কম হলে খাওয়ার রুচি বাড়ে, ফলে ওজনও বাড়ে

ওজন কমানোর কৌশল

  • খেতে বসে আগে দুই গ্লাস পানি পান করুন, তারপর মূল খাবার
  • প্লেটে ভাত একবারই নিন (নিক্তি দিয়ে মাপার চেয়ে এটা মানা সহজ) এবং ওইটুকু দিয়েই খাবার শেষ করুন
  • লাল চাল বা লাল আটার রুটি খান
  • প্রচুর সবুজ শাকসবজি খান। সবুজ ও রঙিন শাক, কচুর লতি, বাঁধাকপি, ডাটা, ঢেঁড়স, বরবটি, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, ফুলকপি, পটল। এসব সবজিতে আঁশ বেশি আর শর্করা কম
  • খাবারে আমিষ বাড়ান, বিশেষ করে মাছ
  • একবারে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে কয়েকবারে খান
  • নিজের সব কাজ নিজে করুন: কাপড় ধোয়া, ইস্ত্রি, কাউকে হুকুম না দিয়ে নিজে পানি ও খাবার নেওয়া, নিজের থালা গ্লাস পরিষ্কার করা, ঘর গোছানো, বাগান করা
  • প্রতিদিন হাঁটুন, হাঁটু ও নিতম্বের জয়েন্ট ভালো থাকলে
  • সাঁতার কাটতে পারেন, তবে অবশ্যই ঠান্ডা পানিতে নয়
  • চিকিৎসকের পরামর্শে সাধারণ কিছু ব্যায়াম করুন
  • মাঝেমধ্যে ওজন মাপুন আর লিখে রাখুন। এটাও ওজন কমাতে সাহায্য করে

আরও কিছু সহায়ক পরামর্শ

  • প্রচুর পানি পান করলে শরীরের বিপাক (Metabolism) বাড়ে
  • টক দই পেটের চর্বি ভাঙতে সাহায্য করে। প্রতি মূল খাবারের আগে দুই টেবিল চামচ টক দই খেতে পারেন
  • গ্রিন টি ও আদা শরীরের চর্বি কমাতে সাহায্য করে
  • অ্যালোভেরা ও কাঁচা হলুদ শরীরের প্রদাহ কমায়

পেটের চর্বি কমাতে আদর্শ খাবার: টক দই, সব ধরনের বাদাম (বিশেষ করে আমন্ড), সব ধরনের মাছ, সব ধরনের বেরি জাতীয় ফল, লেটুস পাতা এবং ওটমিল।

প্রতি বেলার সহজ নিয়ম: আগে দুই গ্লাস পানি, তারপর দুই টেবিল চামচ টক দই, তারপর মূল খাবার।

গ্লাইসেমিক ইনডেক্স: কোন খাবার রক্তে চিনি বেশি বাড়ায়

গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (Glycaemic Index) বলে দেয়, খাবার খাওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে সেটি রক্তে চিনির পরিমাণ কতটা বাড়াবে। যে খাবারের সূচক যত বেশি, সেটি রক্তের চিনি তত বেশি বাড়ায়।

বেশি সূচকের খাবার (কম খাবেন): সাদা চালের ভাত, সাদা রুটি ও পরোটা, সব ধরনের চিনি ও গুড়, মধু, আলু।

কম সূচকের খাবার (বেশি খাবেন): লাল রুটি, লাল চাল, ওটমিল, বার্লি, ভুট্টা, মিষ্টি আলু, মটরশুঁটি ও সিমজাতীয় খাবার, ডাল, সবুজ শাকসবজি, গাজর।

পূর্ণ শস্য আর মিহি শস্য কী

পূর্ণ শস্য (Whole Grain)-এ তিনটি অংশ থাকে:

  • খোসা বা তুষ (Bran): এতে আছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ও আঁশ
  • অঙ্কুর (Germ): বীজের ভ্রূণ, যা থেকেই গাছ হয়। এতে আছে আমিষ, ভিটামিন বি, অনেক খনিজ ও শরীরের জন্য উপকারী তেল
  • শ্বেতসার অংশ (Endosperm): বীজের সবচেয়ে বড় অংশ, আমরা প্রধানত এটাই খাই। এতে থাকে শর্করা, আমিষ, ভিটামিন ও খনিজ

পূর্ণ শস্যের উদাহরণ: লাল চাল (না ছাঁটা, কুঁড়াসহ), লাল গম, ভুট্টা, ভুসিসহ লাল রুটি, ওটস।

মিহি শস্যের (Refined Grain) উদাহরণ: ছাঁটা বা পরিষ্কার সাদা চাল, ভুসি ছাড়া সাদা রুটি, ময়দা।

খাবারের আঁশ কী এবং কেন দরকার

আঁশ (Fibre) আমাদের খাবারের এমন এক অংশ, যা হজম হয় না এবং প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থায় মলের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। স্বাস্থ্যকর খাবারের একটি প্রধান শর্ত হলো তাতে প্রচুর আঁশ থাকা। আঁশ দুই ধরনের।

দ্রবণীয় আঁশ: পানিতে গলে জেলির মতো হয়। রক্তের খারাপ কোলেস্টেরল কমায় এবং রক্তের চিনি স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। পাওয়া যায় সিমজাতীয় খাবার, মটরশুঁটি, লেবুজাতীয় ফল ও আপেল, ইসবগুলের ভুসি, সব ধরনের বাদাম, ওটস ও গাজরে।

অদ্রবণীয় আঁশ: পানিতে গলে না। মলের পরিমাণ বাড়ায়, পরিপাকতন্ত্রকে সচল রাখে, কোষ্ঠকাঠিন্য কমায় এবং অনিয়মিত মলত্যাগকে নিয়মিত করে। পাওয়া যায় লাল চাল, লাল আটা, সব ধরনের সবুজ শাকসবজি, সিম ও মটরশুঁটিজাতীয় খাবারে।

দুই ধরনের আঁশই খাওয়া উচিত।

আঁশের উপকারিতা

  • রক্তের খারাপ কোলেস্টেরল কমায়, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে
  • রক্তের চিনি স্বাভাবিক রাখে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে
  • ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে
  • পরিপাকতন্ত্রের কাজ স্বাভাবিক করে, পরিপাকতন্ত্রের প্রদাহ কমায়
  • মলের পরিমাণ বাড়িয়ে সহজে বের করে দেয়। যাঁদের দীর্ঘদিন নরম বা পাতলা পায়খানা হয়, আঁশ পানি শোষণ করে তাঁদের পায়খানাও স্বাভাবিক করে

বেশি আঁশ পেতে কী করবেন

  • সকালের নাশতা থেকেই আঁশযুক্ত খাবার খান
  • পূর্ণ শস্য খান
  • প্রতি বেলায় সিম, ডাল বা মটরশুঁটিজাতীয় কিছু রাখুন
  • প্রতি বেলায় সবুজ সবজি খান
  • প্রচুর পানি পান করুন, কারণ আঁশ পানি পেয়ে ফুলে উঠলে সবচেয়ে ভালো কাজ করে। এতে মলের পরিমাণ বাড়ে, নরম হয় এবং সহজে বেরিয়ে যায়

এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। নিজের জন্য সঠিক খাবার ও ব্যায়ামের পরিকল্পনা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

বিএমআই (BMI) অনুযায়ী কখন ওজনকে মাত্রাতিরিক্ত বা মোটা বলা হয়?

ওজনকে (কেজি) উচ্চতার (মিটার) বর্গ দিয়ে ভাগ করে বিএমআই বের করা হয়। বিএমআই ১৮.৫ থেকে ২৪.৯ হলে স্বাভাবিক, ২৫ থেকে ২৯.৯ হলে মাত্রাতিরিক্ত ওজন এবং ৩০-এর ওপরে হলে মাত্রাতিরিক্ত মোটা ধরা হয়।

খাবার খাওয়ার কোন সহজ নিয়মে ওজন ও পেটের চর্বি কমানো যায়?

প্রতি বেলা মূল খাবারের আগে দুই গ্লাস পানি এবং দুই টেবিল চামচ টক দই খেয়ে মূল খাবার শুরু করুন। প্লেটে ভাত একবারই নিন, একবারে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে কয়েকবারে খান এবং খাবারে প্রচুর সবুজ শাকসবজি ও মাছ রাখুন।

ওজন নিয়ন্ত্রণে খাবারের আঁশ কীভাবে সাহায্য করে?

আঁশযুক্ত খাবার রক্তের খারাপ কোলেস্টেরল কমায়, রক্তের চিনি স্বাভাবিক রাখে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। আঁশ পানি পেয়ে ফুলে উঠে সবচেয়ে ভালো কাজ করে, তাই আঁশযুক্ত খাবারের সঙ্গে প্রচুর পানি পান করা জরুরি।

এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

আরও পড়ুন

সব প্রবন্ধ
সাধারণ স্বাস্থ্যCancer

ক্যান্সার: কী, কেন হয়, কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায়

ক্যান্সার সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে ভয় কমে এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া সহজ হয়। ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ, ঝুঁকির কারণ ও প্রতিরোধের সহজ উপায় জানুন।

পড়ুন · ৬ মিনিট
সাধারণ স্বাস্থ্যHigh Blood Pressure

উচ্চ রক্তচাপ: নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে সহজ নিয়ম

প্রতি তিনজনে একজন উচ্চ রক্তচাপে ভুগলেও শুরুতে প্রায়ই কোনো লক্ষণ থাকে না। এই নীরব ঘাতক নিয়ন্ত্রণে সঠিক খাবার, ব্যায়াম ও জীবনযাপনের সহজ নিয়ম জানুন।

পড়ুন · ৬ মিনিট
হাড় ও জয়েন্টArthritis

আর্থ্রাইটিস: জয়েন্টের ব্যথা, প্রদাহ আর সুস্থ থাকার সহজ পথ

আর্থ্রাইটিস বা জয়েন্টের প্রদাহ কেন হয় ও কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন? সঠিক চিকিৎসা, খাবার ও ব্যায়ামে ব্যথা কমিয়ে ভালো থাকার উপায় জানুন।

পড়ুন · ৭ মিনিট