ক্যান্সারের নাম শুনলেই আমরা ভয় পাই। কিন্তু রোগটা সম্পর্কে একটু পরিষ্কার ধারণা থাকলে ভয় কমে, সচেতনতা বাড়ে, আর সময়মতো চিকিৎসা নেওয়াও সহজ হয়।
ক্যান্সার আসলে কী
আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের একটা নির্দিষ্ট জীবনচক্র আছে। কোষ জন্ম নেয়, বড় হয়, কাজ করে, তারপর ধ্বংস হয়ে যায়।
ক্যান্সার কোষের এই নিয়ম নেই। এরা অস্বাভাবিক কোষ, যারা মরে না। উল্টো নিয়ন্ত্রণহীনভাবে সংখ্যায় বাড়তে থাকে। একসময় এরা স্বাভাবিক কোষের কাজে বাধা দেয়, আর তখনই ক্যান্সারের লক্ষণ দেখা দেয়।
কোষ, ডিএনএ ও জিন
প্রতিটি কোষের ভেতরে ক্রোমোজোম থাকে, যা ডিএনএ (DNA) দিয়ে তৈরি। ডিএনএ আবার তৈরি জিন (Gene) দিয়ে। একটি কোষ কতটা বড় হবে, কী কাজ করবে, কতবার ভাগ হবে, কখন ধ্বংস হবে, সবই জিন নিয়ন্ত্রণ করে।
ক্যান্সার মূলত জিনের রোগ। স্বাভাবিক জিনে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে ক্যান্সার কোষ তৈরি হতে পারে। এই ত্রুটি কোষ ভাগ হওয়ার সময় আপনা থেকেও হতে পারে, আবার পরিবেশের নানা কারণেও হতে পারে।
জিনে ত্রুটির কিছু কারণ
- ধূমপান (সিগারেটের ধোঁয়ায় ক্যান্সার সৃষ্টিকারী অনেক রাসায়নিক থাকে)
- পরিবেশের বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ
- খাবারে মেশানো ক্ষতিকর রাসায়নিক
- এক্সরে ও এ ধরনের কিছু রশ্মি
- সূর্যের অতিরিক্ত রশ্মি
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্যান্সারের সঠিক কারণ আজও জানা যায়নি।
ঝুঁকি বাড়ায় যেসব বিষয়
- ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য
- অতিরিক্ত ওজন
- শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম না করা
- ক্ষতিকর খাবার ও ক্ষতিকর কাজের পরিবেশ (নিচে বিস্তারিত)
- কিছু ভাইরাস ও জীবাণুর সংক্রমণ
- পরিবারে কারও ক্যান্সার থাকা
- নারীদের ক্ষেত্রে সন্তান না হওয়া বা দেরিতে সন্তান নেওয়া
- কিছু ওষুধ
প্রাথমিক লক্ষণ, যা অবহেলা করা ঠিক নয়
প্রায় সব ধরনের ক্যান্সারেই শুরুতে কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা যায়:
- কিছুই ভালো না লাগা, একটা অস্বস্তির ভাব
- যথেষ্ট বিশ্রামের পরও ক্লান্তি কাটে না
- অল্পতেই ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়া
- খাওয়ায় রুচি কমে যাওয়া
- অল্প সময়ে ওজন কমে যাওয়া
এরপর ক্যান্সার শরীরের যে জায়গায় হয়েছে, সে অনুযায়ী আলাদা লক্ষণ দেখা দেয়। শুরুতেই রোগীর কথা মন দিয়ে শুনে ব্যবস্থা নিলে অনেক ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে, আর তখন ফলাফল অনেক ভালো হয়। তাই এসব লক্ষণ দীর্ঘদিন থাকলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
যেসব খাবার ও অভ্যাস ঝুঁকি বাড়াতে পারে
যেসব খাবার আমরা প্রায় প্রতিদিন খাই, তার মধ্যেই কিছু ঝুঁকি লুকিয়ে থাকতে পারে। এগুলো কমিয়ে আনলে ভালো:
- কৌটাজাত ও প্রক্রিয়াজাত মাছ, মাংস এবং অন্যান্য খাবার
- বেশি পরিমাণে লাল মাংস (গরু, খাসি)
- কৃত্রিম মিষ্টি এবং "ফ্যাট ফ্রি", "লো ফ্যাট" লেখা কৃত্রিম খাবার
- সব ধরনের কোমল পানীয়
- অ্যালকোহল
- সাদা চিনি ও সাদা ময়দা
- খুব গরম পানীয়, যেমন ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি গরম চা, কফি বা দুধ
- মচমচে করে ভাজা খাবার, যেমন চিপস বা বেশি ভাজা মাছ, মাংস, সবজি
- গ্রিল ও বারবিকিউ করা খাবার, বিশেষ করে পোড়া অংশ
- ক্ষতিকর তেল
- অতিরিক্ত লবণে জারানো খাবার
মশলা (Spices) নিরাপদ। পরিমিত পরিমাণে খেতে পারেন।
বাসি ও ছত্রাকধরা খাবার থেকে সাবধান
আফলাটক্সিন (Aflatoxin) খুবই শক্তিশালী ক্যান্সার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক। এটি বাসি খাবারে এবং ছত্রাক ধরা পুরোনো বাদাম, চাল, ডাল, গম, ভুট্টায় জন্মাতে পারে। এসব খাবার ফেলে দিন।
যেসব পরিবেশ ও কাজ ঝুঁকি বাড়ায়
- ইঞ্জিনের ধোঁয়া, কয়লা পোড়ানোর ধোঁয়া, কাঠের গুঁড়া ও বালির কণায় দূষিত বাতাস
- দীর্ঘ সময় সরাসরি রোদে থাকা
- ঘরে গ্যাস স্টোভ, কেরোসিন হিটার বা কেরোসিনের বাতির ধোঁয়া
- ঘরের ভেতরে ধূমপান, যা বাসার সবার জন্যই ক্ষতিকর
- অ্যাসবেস্টস (Asbestos)
কিছু ওষুধ নিয়েও সতর্ক থাকা ভালো। উচ্চ রক্তচাপের কিছু ওষুধের (যেমন ভালসারটান ও লোসারটান) কিছু ব্যাচে ক্ষতিকর উপাদান পাওয়ার খবর এসেছে। আপনি এই ধরনের ওষুধ খেলে নিজে থেকে বন্ধ করবেন না, চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে নিন।
ক্যান্সার ঠেকানোর সহজ উপায়
ক্যান্সারের সঠিক কারণ অজানা, তাই পুরোপুরি প্রতিরোধের নিশ্চিত উপায়ও নেই। তবে কিছু অভ্যাস ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে।
- তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য পুরোপুরি ছেড়ে দিন।
- ওজন স্বাভাবিক রাখুন। আপনার বয়স, গঠন, লিঙ্গ ও উচ্চতা অনুযায়ী কত ওজন ঠিক, তা চিকিৎসক বলে দেবেন।
- শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন। সাধ্যমতো নিজের কাজ নিজে করুন, হাঁটাহাঁটি করুন। এক নাগাড়ে এক ঘণ্টার বেশি বসে থাকবেন না। প্রতি ঘণ্টায় উঠে ৩ থেকে ৪ মিনিট হাঁটুন।
- দুপুরের কড়া রোদে বেশিক্ষণ থাকবেন না।
- ভ্যাকসিনগুলো ঠিক সময়ে নিন।
- নিরাপদ যৌনাচার মেনে চলুন।
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান।
- মায়েরা শিশুকে অন্তত ছয় মাস বয়স পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ান। এরপর শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শে অন্য খাবার যোগ করুন।
- ক্যান্সারের চিকিৎসার সময় ও পরেও এই জীবনধারা মেনে চলুন।
কী খাবেন
প্রতিদিন রাখুন
- তাজা ফল (পরিমিত পরিমাণে)
- সবুজ ও রঙিন শাকসবজি, যেমন বাঁধাকপি, ব্রকোলি, লেটুস
- সব ধরনের টক ফল, আমলকি, টমেটো, পেয়ারা, তরমুজ ও বেরিজাতীয় ফল
- মটরশুঁটি ও সিমজাতীয় খাবার
- কুঁড়াসহ চাল ও ভুসিসহ আটা
- বীজজাতীয় খাবার ও কাঁচা বাদাম (পরিমিত)
- অল্প পরিমাণ কাঁচা রসুন, আদা ও হলুদ
- পুদিনা, রোজমেরি ও ধনিয়া পাতা
রান্না ও খাওয়ার কিছু ছোট নিয়ম
- শাকসবজি আধা সেদ্ধ করে খান। বেশি সেদ্ধ করবেন না।
- প্রতিদিন অন্তত একটি কাঁচা ফল বা সবজি রাখুন।
- কাটার আগে সব শাকসবজি ও ফল ভালো করে ধুয়ে নিন, কীটনাশক কমবে।
- মচমচে ভাজার চেয়ে সেদ্ধ খাবার ভালো।
- মাইক্রোওয়েভে প্লাস্টিকের মোড়ক ব্যবহার করবেন না। মোম মাখানো কাগজ ব্যবহার করুন।
পানীয়
- বেছে নিন: বিশুদ্ধ পানি, গ্রিন টি, হার্বাল টি, সাধারণ দুধ
- এড়িয়ে চলুন: কোমল পানীয়, এনার্জি ড্রিংক, ফলের গন্ধযুক্ত মিষ্টি পানীয়, বেশি চিনির চা বা কফি, চিনি মেশানো দুধ
বেশি ক্যালরির যেসব খাবার কম খাবেন
লাল মাংস ও প্রক্রিয়াজাত মাংস, সব ধরনের মিষ্টি ও মিষ্টান্ন, তেলে ভাজা খাবার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, পাস্তা, পনির এবং শর্করা বেশি এমন সবজি, যেমন আলু। এসব একেবারে নিষিদ্ধ নয়, পরিমিত খাওয়া যায়।
আপনার প্রশ্ন, সহজ উত্তর
কার ক্যান্সার হতে পারে?
যে কোনো মানুষের, যে কোনো সময়। তবে ঝুঁকি বাড়ানোর কিছু কারণ আছে, যা ওপরে বলা হয়েছে।
ক্যান্সার কি ছোঁয়াচে?
না। ক্যান্সার ছোঁয়াচে নয়।
ক্যান্সার কোষ কি অমর?
না। যে ক্যান্সার কোষ বাড়তে পারে না, সেটি মরে যায়।
ক্যান্সার প্রতিরোধের ভ্যাকসিন আছে?
সরাসরি ক্যান্সার ঠেকানোর ভ্যাকসিন নেই। তবে কিছু ভাইরাস ক্যান্সার ঘটাতে পারে, আর সেসব ভাইরাসের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন আছে। এগুলো ভালো ফল দিচ্ছে।
ক্যান্সার কি জেনেটিক রোগ?
হ্যাঁ। ক্যান্সার হতে হলে স্বাভাবিক জিনে পরিবর্তন ঘটতে হয়। এই পরিবর্তন জন্মগত হতে পারে, আবার জন্মের পরে পরিবেশের কারণেও হতে পারে।
ক্যান্সার কি পুরোপুরি সারে?
হ্যাঁ, সারতে পারে। বিশেষ করে শুরুর দিকে ধরা পড়লে।
কখন ডাক্তারের কাছে যাব?
ওপরের প্রাথমিক লক্ষণগুলো সন্দেহ হলেই। কিছু পরীক্ষা করিয়ে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে নিন। তবে মনে রাখবেন, এমন কোনো পরীক্ষা নেই যা একশো ভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারে।
ক্যান্সার ধরা পড়তে কত সময় লাগে?
প্রায়ই কয়েক বছর। বেশিরভাগ স্তন ক্যান্সার ও খাদ্যনালীর ক্যান্সার ধরা পড়ার আগে প্রায় দশ বছর কেটে যায়। পুরুষের প্রোস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণ দেখা দিতে চল্লিশ বছরও লাগতে পারে।
সংক্রমণ থেকে কি ক্যান্সার হতে পারে?
হ্যাঁ। পাকস্থলীতে হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি জীবাণু, লিভারে হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস, জরায়ুমুখে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।
স্ক্রিনিং: লক্ষণ আসার আগেই ধরে ফেলা
অনেক শিক্ষিত মানুষও ক্যান্সারের লক্ষণ সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানেন না। স্ক্রিনিং (বাছাই পরীক্ষা) এমন একটি পদ্ধতি, যাতে লক্ষণ দেখা দেওয়ার অনেক আগেই ক্যান্সার ধরা যায়। এতে অনেক ক্যান্সার নিরাময়ের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার সময় রোগ প্রায়ই অনেক দূর এগিয়ে যায়, তখন চিকিৎসায় লাভ কম হয়।
স্ক্রিনিং করা হয় যেসব ক্যান্সারের জন্য:
- খাদ্যনালীর ক্যান্সার
- পাকস্থলীর ক্যান্সার
- স্তন ক্যান্সার
- জরায়ুমুখের ক্যান্সার
- ফুসফুসের ক্যান্সার
কখন কোন স্ক্রিনিং করাবেন, তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন। পরিবারে কারও এসব ক্যান্সার থাকলে অনেক কম বয়স থেকেই স্ক্রিনিং শুরু করা উচিত।
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। নিজের ঝুঁকি ও করণীয় নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণগুলো কী কী?
প্রায় সব ধরনের ক্যান্সারেই শুরুতে কিছুই ভালো না লাগা, যথেষ্ট বিশ্রামের পরও ক্লান্তি না কাটা এবং অল্পতেই ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়। এছাড়া খাওয়ায় রুচি কমে যাওয়া এবং অল্প সময়ে ওজন কমে যাওয়াও প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
ক্যান্সার কি ছোঁয়াচে এবং এটি কি পুরোপুরি সারে?
না, ক্যান্সার ছোঁয়াচে রোগ নয়। তবে শুরুর দিকে বা প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সঠিক চিকিৎসায় ক্যান্সার পুরোপুরি সারতে পারে।
সংক্রমণ থেকে কি ক্যান্সার হতে পারে?
হ্যাঁ, কিছু ভাইরাস ও জীবাণুর সংক্রমণ ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। যেমন পাকস্থলীতে হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি জীবাণু, লিভারে হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস এবং জরায়ুমুখে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) থেকে ক্যান্সার হতে পারে।
এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।