সাধারণ স্বাস্থ্য

উচ্চ রক্তচাপ: নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে সহজ নিয়ম

উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় নীরব ঘাতক। প্রতি তিনজনে একজন এই রোগে ভোগেন। অথচ বেশিরভাগ মানুষ টেরই পান না। অনেক সময় কোনো একটি জটিলতা হওয়ার পরই ধরা পড়ে যে তাঁর উচ্চ রক্তচাপ ছিল।

রক্তচাপ কী

আমাদের শরীরে রক্ত চলাচল করে ধমনী ও শিরা নামের নালী দিয়ে। রক্ত প্রবাহিত হওয়ার সময় ধমনীর দেয়ালে যে চাপ দেয়, সেটাই রক্তচাপ। এই চাপের একটি স্বাভাবিক মাত্রা আছে। আপনার বয়স, লিঙ্গ ও শরীরের গঠন বিবেচনা করে চিকিৎসক বলবেন, আপনি উচ্চ রক্তচাপের রোগী কি না।

কেন হয়

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কারণ জানা যায় না। মাত্র পাঁচ শতাংশ রোগীর সঠিক কারণ ধরা পড়ে। তবে কিছু ঝুঁকির কারণ আছে। যত বেশি ঝুঁকির কারণ থাকবে, উচ্চ রক্তচাপের সম্ভাবনাও তত বাড়বে:

  • পরিবারে উচ্চ রক্তচাপ থাকা (বাবা, মা, দাদা, দাদি, নানা, নানি)
  • ষাট বছরের বেশি বয়স
  • ওজন অনেক বেড়ে যাওয়া
  • ধূমপান
  • অতিরিক্ত মানসিক চাপ
  • অন্য কিছু অসুখ, যেমন ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ, হৃদরোগ
  • শারীরিক অলসতা, পরিশ্রম না করা
  • খাবারে অতিরিক্ত লবণ ও তেলচর্বি

লক্ষণ

প্রাথমিক অবস্থায় বেশিরভাগ সময় কোনো লক্ষণই থাকে না, আর এটাই এই রোগের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক। তবে কারও কারও দেখা দিতে পারে:

  • অনেকদিন ধরে ঘুমের সমস্যা
  • দুশ্চিন্তা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ
  • প্রচুর ঘাম
  • প্রায়ই বা সবসময় মাথা ধরা, বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে উঠে মাথার পেছনে ব্যথা
  • মুখ প্রায়ই লালচে হয়ে যাওয়া
  • হঠাৎ নাক দিয়ে রক্ত পড়া
  • প্রায়ই হতবুদ্ধি লাগা, মাথা ঘোরা, মাথা ঝিমঝিম করা
  • চোখে কম দেখা

জটিলতা কী কী হতে পারে

  • পক্ষাঘাত (স্ট্রোক)
  • হার্ট অ্যাটাক
  • কিডনি বিকল হওয়া
  • দৃষ্টিশক্তি হারানো
  • স্মরণশক্তি, চিন্তাশক্তি ও মেধা কমে যাওয়া
  • ডিমেনশিয়া

প্রতিরোধ কি সম্ভব

হ্যাঁ, স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনে অনেকটাই সম্ভব:

  • সুষম খাবার খান। সাধারণ লবণ কমান, পটাশিয়াম বাড়ান
  • পূর্ণ শস্য (Whole Grain) খান
  • তেলচর্বিযুক্ত খাবার বাদ দিন
  • ফল ও শাকসবজি বাড়ান
  • আঁশযুক্ত খাবার খান
  • প্রচুর পানি পান করুন
  • নিয়মিত ব্যায়াম করুন এবং ওজন স্বাভাবিক রাখুন
  • ধূমপান ও মাদক ছাড়ুন
  • মানসিক চাপ সামলাতে শিখুন

যাঁদের ঝুঁকির কারণ আছে, তাঁরা যতটা সম্ভব সেগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন।

রিফাইন্ড শস্য আর পূর্ণ শস্য কী? রিফাইন্ড শস্যে শুধু শস্যের ভেতরের শ্বেতসার অংশটুকু থাকে। পূর্ণ শস্যে থাকে কুঁড়া, শ্বেতসার ও ভ্রূণ, তিনটিই। যেমন লাল চাল (ঢেঁকিছাঁটা বা কুঁড়াসহ চাল) আর লাল আটা (তুষসহ)। যেসব ফল খোসাসহ খাওয়া যায়, সেগুলো খোসাসহ খান।

কিছু জরুরি উপদেশ

  • কোনো কারণেই উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ বন্ধ করবেন না। কোনো বেলার খাবার বাদ পড়লেও ওষুধ বাদ দেবেন না। নিয়ম মেনে ওষুধ খান।
  • খাবারে লবণ কমান। খাওয়ার টেবিলে আলাদা করে লবণ নেওয়া বন্ধ করুন।
  • শান্ত, ঝামেলামুক্ত জীবন কাটানোর চেষ্টা করুন।
  • প্রতিদিন কিছু ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটির অভ্যাস করুন। নিজের কাজ নিজে করুন।
  • কমপক্ষে আট ঘণ্টা ঘুমান।
  • ধূমপান, কফি ও মদ বাদ দিন।
  • বাড়তি ওজন কমান।
  • নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন এবং চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন।
  • পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান।
  • চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফলিক অ্যাসিড, ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার ও সম্পূরক নিতে পারেন।
  • অল্প পরিমাণ কাঁচা রসুন, আদা ও হলুদ প্রতিদিন খেতে পারেন।

কী খাবেন

  • পূর্ণ শস্য: লাল চাল, কুঁড়াসহ চাল, লাল আটা, ওটমিল
  • সবুজ ও রঙিন শাকসবজি (এতে প্রচুর পটাশিয়াম থাকে): লেটুস, পুঁইশাক, বিট, ব্রকোলি, মিষ্টি আলু, গাজর
  • তরমুজ, কমলা, কলা, আপেল, আমলকি, টমেটো ও সব টক ফল
  • চর্বি ছাড়ানো দুধ ও দই
  • সব ধরনের বাদাম
  • আমাদের দেশের সব ধরনের মাছ (চিংড়ি ও ইলিশ একটু কম খাওয়া ভালো)
  • তিল, তিসি, কুমড়ার বীজ, সূর্যমুখীর বীজ, সিমের বীজের মতো সব ধরনের বীজ
  • ডার্ক চকোলেট, অলিভ অয়েল, গ্রিন টি
  • চামড়া ছাড়া মুরগি, টার্কি এবং চর্বি ছাড়া অল্প গরুর মাংস
  • লবণ ছাড়া পানির মতো সাধারণ পানি

পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার: মিষ্টি আলু, বিট, মটরশুঁটি, শশা, কলা, খেজুর, কিশমিশ, আঙুর, পুঁইশাক ও টমেটো।

বেশি আঁশযুক্ত খাবার: পূর্ণ শস্য, সবুজ ও রঙিন শাকসবজি (যত সবুজ, তত আঁশ), কাঁচা কলা, মটরশুঁটি, ডাটা, বরবটি ও সিমজাতীয় সব খাবার, ঢেঁড়স, বাঁধাকপি, পটল।

কী এড়াবেন

  • সাদা চাল ও সাদা আটা (রিফাইন্ড শস্য)
  • কৌটাজাত সব ধরনের সবজি, মাছ ও মাংস
  • কফি ও মদ
  • ইনস্ট্যান্ট স্যুপ
  • কৌটার সস ও কেচাপ
  • পিৎজা, ক্যান্ডি, পেস্ট্রি
  • কোমল পানীয়
  • পনির (লবণ ছাড়া হলে অল্প খাওয়া যায়)

খারাপ চর্বি বা তেল: গরু ও খাসির মাংস, মুরগির রানের মাংস, হাঁস ও মুরগির চামড়া, ননীসহ পূর্ণ দুধ, মাখন, পনির, ঘি, মার্জারিন (তবে অলিভ অয়েলে তৈরি হলে চলে), আইসক্রিম, নারকেল তেল, পাম অয়েল ও সব ধরনের মাংসের চর্বি।

ভালো চর্বি বা তেল: অলিভ অয়েল, আখরোটের তেল, সূর্যমুখীর তেল, তিসির তেল, মাছ ও মাছের তেল, চামড়া ছাড়া মুরগির বুকের মাংস, কর্ন অয়েল ও সয়াবিন তেল।

ভালো-খারাপ তেল চেনার সহজ উপায়: ঘরের সাধারণ তাপমাত্রায় যে তেল তরল থাকে, সেগুলো ভালো। যেগুলো জমে যায়, সেগুলো শরীরের জন্য খারাপ।

কোন ব্যায়াম করবেন

হৃদযন্ত্রের কাজ বাড়ায়, এমন ব্যায়াম চিকিৎসকের পরামর্শে করুন:

  • জগিং, হাঁটাহাঁটি, সাইকেল চালানো, সাঁতার
  • মেঝে মোছা, বাগানের কাজ, পাতা কুড়ানো
  • সিঁড়ি দিয়ে তিন তলা পর্যন্ত ওঠানামা
  • মাঠে টেনিস বা বাস্কেটবল খেলা, নাচ
  • হাতে হালকা ওজন নিয়ে ব্যায়াম
  • নিজের সব কাজ নিজে করা, এটাও খুব ভালো ব্যায়াম

এগুলোকে বলে অ্যারোবিক ব্যায়াম, যা হৃৎস্পন্দন ও শ্বাসের গতি বাড়ায় এবং রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে করলেই চলে। সপ্তাহে একদিন হঠাৎ করে ব্যায়াম করা ঠিক নয়।

ব্যায়ামের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ অবশ্যই নেবেন, যদি:

  • বয়স ৪৫ এর বেশি হয়
  • ধূমপান করেন
  • ওজন অনেক বেশি হয়
  • ডায়াবেটিস বা শ্বাসকষ্ট থাকে
  • রক্তে কোলেস্টেরল অনেক বেশি এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকে
  • আগে হৃদরোগের কারণে বুকে ব্যথা হয়ে থাকে
  • পরিবারে হৃদরোগ থাকে বা ছিল
  • সামান্য পরিশ্রমেই মাথা ঝিমঝিম করে

ব্যায়ামের কিছু সাধারণ উপদেশ

  • নিজে নিজে ব্যায়াম বেছে নেবেন না, চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে নিন
  • রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত থাকলে ভারী ব্যায়াম শুরু করবেন না। আগে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনুন
  • ব্যায়ামের আগে ঠিকমতো ওষুধ খেয়েছেন কি না দেখে নিন
  • সাধারণ হাঁটা দিয়ে শুরু করুন, সঠিক জুতা পরুন
  • কতটা হাঁটছেন, তা মাপতে মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন
  • ভারী ওজন বহন ও রেজিস্ট্যান্স ব্যায়াম রক্তচাপ বাড়াতে পারে। এগুলো এড়িয়ে চলুন বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে শুরু করুন
  • এমন ব্যায়াম বেছে নিন, যা আপনার জন্য নিরাপদ, কার্যকর এবং উপভোগ্য

ব্যায়ামের সময় এই লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে থেমে যান: বুক, ঘাড়, চোয়াল বা বাহুতে ব্যথা, বুকে চাপ বা ধড়ফড়, মাথা ঝিমঝিম, দুর্বল ও নিস্তেজ লাগা, অতিরিক্ত দ্রুত শ্বাস, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন।

কখন অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাবেন

আপনি নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছেন, খাবার ও ব্যায়ামের উপদেশ মানছেন, তবু যদি:

  • রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকে
  • নতুন কিছু লক্ষণ দেখা দেয়, যেমন ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, ঘনঘন শ্বাস, মাথাব্যথা বা মাথা ধরা, অতিরিক্ত ঘাম, বুক ধড়ফড়, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন, চোখে দেখার সমস্যা, দ্বিধা বা বিভ্রান্তি

এসব উচ্চ রক্তচাপের কারণে বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও হতে পারে।

এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। নিজের জন্য কোন খাবার, ব্যায়াম ও ওষুধ উপযুক্ত, তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

উচ্চ রক্তচাপকে নীরব ঘাতক বলা হয় কেন?

উচ্চ রক্তচাপে প্রতি তিনজনে একজন ভুগলেও প্রাথমিক অবস্থায় বেশিরভাগ মানুষ কিছুই টের পান না এবং কোনো লক্ষণ থাকে না। অনেক সময় স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক বা কিডনি বিকল হওয়ার মতো বড় জটিলতা দেখা দেওয়ার পর এই রোগ ধরা পড়ে বলে একে নীরব ঘাতক বলা হয়।

কোনো বেলার খাবার বাদ পড়লে কি উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ বন্ধ রাখা যাবে?

না, কোনো কারণেই উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করা যাবে না। এমনকি কোনো বেলার খাবার বাদ পড়লেও নিয়ম মেনে ওষুধ চালিয়ে যেতে হবে এবং নিয়মিত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কোন ধরনের খাবার ও তেল ভালো?

খাবারে লবণ কমিয়ে লাল চাল ও লাল আটার মতো পূর্ণ শস্য, পটাশিয়ামসমৃদ্ধ সবুজ শাকসবজি, ফল, মাছ ও বাদাম খাওয়া উপকারী। আর ঘরের সাধারণ তাপমাত্রায় যে তেল তরল থাকে—যেমন অলিভ অয়েল, সূর্যমুখীর তেল, তিসির তেল বা সয়াবিন তেল—সেগুলো শরীরের জন্য ভালো, কিন্তু জমে যাওয়া চর্বি এড়িয়ে চলা উচিত।

এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

আরও পড়ুন

সব প্রবন্ধ
সাধারণ স্বাস্থ্যCancer

ক্যান্সার: কী, কেন হয়, কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায়

ক্যান্সার সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে ভয় কমে এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া সহজ হয়। ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ, ঝুঁকির কারণ ও প্রতিরোধের সহজ উপায় জানুন।

পড়ুন · ৬ মিনিট
সাধারণ স্বাস্থ্যObesity and Weight Loss

ওজন কমানোর সহজ কৌশল: মোটা হওয়ার কারণ, খাবার ও অভ্যাস

ওজন বাড়ানো সহজ হলেও কমানো বেশ কঠিন। খাবারের সহজ নিয়ম, আঁশযুক্ত পূর্ণ শস্য এবং দৈনন্দিন অভ্যাসে বদল এনে সুস্থভাবে ওজন ও পেটের চর্বি কমানোর কৌশল জানুন।

পড়ুন · ৫ মিনিট
হাড় ও জয়েন্টArthritis

আর্থ্রাইটিস: জয়েন্টের ব্যথা, প্রদাহ আর সুস্থ থাকার সহজ পথ

আর্থ্রাইটিস বা জয়েন্টের প্রদাহ কেন হয় ও কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন? সঠিক চিকিৎসা, খাবার ও ব্যায়ামে ব্যথা কমিয়ে ভালো থাকার উপায় জানুন।

পড়ুন · ৭ মিনিট