হাঁটুর ব্যথা বড়ই যন্ত্রণাদায়ক। যে কোনো বয়সের মানুষ জীবনের যে কোনো সময় হাঁটুর ব্যথায় ভুগতে পারেন, তবে বয়স্করা ভোগেন বেশি।
ব্যথার কারণ
- বেশিরভাগ সময় কোনো কারণ ছাড়াই হাঁটুতে প্রদাহ (আর্থ্রাইটিস) ও ব্যথা হয়
- হাঁটুতে আঘাত, যাতে ভেতরের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়
- ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হওয়া
- ডায়াবেটিস
- বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাবনা বাড়া
- হাঁটুতে সংক্রমণ (সেপটিক আর্থ্রাইটিস)
- হাঁটুর কাছের হাড়ে সংক্রমণ বা টিউমার
লক্ষণ
- হাঁটুতে সবসময় বা থেমে থেমে ব্যথা
- ব্যথার সঙ্গে জ্বর থাকতে পারে
- হাঁটু ফুলে যাওয়া, চামড়া লাল হওয়া
- হাঁটুর আকার ও আকৃতি বদলে যাওয়া
- নড়াচড়া কমে যাওয়া
- হাঁটু পুরোপুরি সোজা করতে না পারা
- হাঁটু মুড়ে বসতে না পারা
- সোজা হয়ে দাঁড়াতে বা হাঁটতে কষ্ট হওয়া
ডায়াবেটিস কীভাবে হাঁটুর ক্ষতি করে
ডায়াবেটিসে, নিয়ন্ত্রিত হোক বা অনিয়ন্ত্রিত, শরীরের সব কোষ ও টিস্যু ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হাঁটুও তার ব্যতিক্রম নয়। শরীরের ভার বইতে তখন হাঁটুর কষ্ট হয়। দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিসে মাংসপেশি দুর্বল হয়ে যায়, ফলে হাঁটুর ওপর নিয়ন্ত্রণ কমে, হাঁটার স্বাভাবিক ধরন বদলে যায় এবং হাঁটুর আকার-আকৃতিও পাল্টে যেতে পারে।
তাই শুধু অতিরিক্ত হেঁটে বা জোরে ব্যায়াম করে ডায়াবেটিস কমানোর চেষ্টা হাঁটুর জন্য ক্ষতিকর। এতে ডায়াবেটিস একটু নিয়ন্ত্রণে এলেও হাঁটুর স্থায়ী ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
ওজন আর হাঁটু
ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে হাঁটুর ভেতরের টিস্যু মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মনে রাখবেন, শরীরের সব ভার হাঁটুই বহন করে। তাই বাড়তি ওজনের কারণে যে কোনো বয়সে, এমনকি কিশোর বয়সেও হাঁটুতে ব্যথা হতে পারে।
হাঁটুর ব্যথা কি আপনা আপনি সারে
হ্যাঁ, সারতে পারে। সামান্য আঘাতের ব্যথা এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে ভালো হয়ে যেতে পারে।
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
- ব্যথার কারণে সোজা হয়ে দাঁড়াতে, হাঁটতে বা হাঁটু মুড়ে বসতে না পারলে
- হাঁটু ফুলে গেলে
- হাঁটুর ওপরের চামড়া লাল হলে
- ব্যথার সঙ্গে জ্বর থাকলে
- হাঁটুতে টিপ দিলে ব্যথা পেলে
- যে কোনো আঘাতের পর হাঁটুতে ব্যথা বা ফোলা হলে
কিশোর বয়সে সতর্কতা: কোনো আঘাতের ঘটনা ছাড়া হঠাৎ হাঁটু বা হাঁটুর আশপাশে ব্যথা অনেক সময় গুরুতর রোগের লক্ষণ। এটি অত্যন্ত জরুরি। একটুও সময় নষ্ট না করে বাচ্চাকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যান। অবশ্যই।
হাঁটু ভালো রাখার সতর্কতা
- ওজন স্বাভাবিক রাখুন
- ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন
- চিকিৎসকের পরামর্শে হাঁটুর সঠিক ব্যায়াম করুন
- ওঠবস ব্যায়াম হাঁটুর জন্য উপকারী, তবে হাঁটুর ভেতরের টিস্যু আগে থেকেই নষ্ট হয়ে থাকলে এটি করা উচিত নয়। বিশেষজ্ঞের উপদেশ নেওয়া জরুরি
- হঠাৎ করে হাঁটুর কোনো নতুন ব্যায়াম বা খেলা শুরু করবেন না। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে করুন
আর্থ্রাইটিসে হাঁটুতে ব্যথা কেন হয়
ব্যথা হওয়ার কারণ মূলত দুটি।
প্রথমত, হাঁটুর জয়েন্ট যে হাড়গুলো দিয়ে তৈরি, তাদের মাথায় কার্টিলেজ থাকে। কার্টিলেজে স্নায়ু নেই, তাই হাঁটার সময় এর ঘষায় ব্যথা হয় না। আর্থ্রাইটিস হলে কার্টিলেজ নষ্ট হয়ে যায় এবং হাড়ে হাড়ে ঘষা লাগে। হাড়ে অনেক স্নায়ু আছে, তাই ব্যথা অনুভূত হয়।
দ্বিতীয়ত, হাঁটুর হাড়ের আশপাশে অনেক টিস্যু আছে। এগুলোর প্রদাহের ফলেও ব্যথা হয়।
প্রশ্ন ও উত্তর
ব্যথা থাকলে হাঁটাহাঁটি করব?
ব্যথা কম থাকলে হাঁটাহাঁটি ও হাঁটুর সাধারণ ব্যায়াম উপকারী, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী। ব্যথা বেশি থাকলে হাঁটা কমিয়ে দিন এবং ব্যায়ামও বন্ধ রাখুন। ব্যথা সহনীয় হলে আবার শুরু করুন।
হাঁটার সময় লাঠি ব্যবহার করব?
হাঁটার সময় শরীরের সব ভার হাঁটুর ওপর পড়ে। আর্থ্রাইটিসের ব্যথার কারণ হাঁটুর দুই হাড়ের ঘষা। লাঠি ব্যবহার করলে আপনার ওজনের একটি অংশ হাত হয়ে লাঠিতে চলে যায়, ফলে হাঁটুর ওপর চাপ কমে ও আরাম লাগে। হাঁটুর আশপাশের মাংসপেশি দুর্বল থাকলে লাঠি ভারসাম্য রাখতেও সাহায্য করে, আর হঠাৎ পড়ে যাওয়া থেকেও বাঁচাতে পারে।
হাঁটু মুড়ে নিচে বসা যাবে?
দেয়াল ঘেঁষে ধীরে ধীরে বসতে পারেন (ওয়াল স্কোয়াট):
- দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ান, পা দুটো দেয়াল থেকে একটু দূরে রাখুন।
- ধীরে ধীরে নিচে বসুন। নিতম্ব যেন হাঁটুর লেভেলের নিচে না নামে।
- হাত দুটো উরুর ওপর না রেখে দুই পাশে ঝুলিয়ে রাখুন।
- বসা অবস্থায় ৩০ সেকেন্ড থেকে এক মিনিট থাকুন।
- প্রতিবার ৩ বার করে দিনে ১৫ থেকে ২০ বার করুন।
চিকিৎসকের নির্দেশমতো করলে পা ও উরুর মাংসপেশি শক্ত হবে, হাঁটুর ভার বইবার ক্ষমতা বাড়বে এবং ব্যথা ধীরে ধীরে কমবে।
সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করব?
ব্যথা বেশি থাকলে কম করুন। ব্যথা সহনীয় হলে এক ধাপ এক ধাপ করে ওঠানামা শুরু করুন। সবসময় রেলিং ধরুন। ওঠার সময় যে পায়ে ব্যথা কম, সেটি আগে তুলুন। নামার সময় যে পায়ে ব্যথা বেশি, সেটি আগে নামান।
গরম না ঠান্ডা সেঁক?
খুব বেশি ব্যথায় ঠান্ডা সেঁক। ব্যথা সহনীয় হলে মৃদু গরম সেঁক। নিয়মটা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন। রাতে ঘুমানোর সময় হিটিং প্যাড ব্যবহার করতে পারেন। গরম পানিতে গোসলও খুব উপকারী।
মালিশ করা যাবে?
চিকিৎসকের পরামর্শে করতে পারেন। মালিশের চাপ কেমন হবে, সেটিও চিকিৎসক বলে দেবেন।
হাঁটুর কাফ (Knee Cuff) ব্যবহার করব?
হাঁটুতে বেশি ব্যথা থাকলে, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা ও অসমান জায়গায় হাঁটার সময় ব্যবহার করতে পারেন। হাঁটার সময় হাঁটুতে দুর্বল লাগলেও করতে পারেন।
- একটানা এক ঘণ্টার বেশি পরবেন না। বেশি সময় পরতে হলে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত পাঁচ মিনিট খুলে রাখুন
- খুব টাইট কাফ ব্যবহার করবেন না
- ভালো মানের কাফ খুঁজে নিন
খাবারের সঙ্গে আর্থ্রাইটিসের সম্পর্ক
হ্যাঁ, আছে।
যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন
- বেকারির খাবার
- সাদা চিনি ও চিনির বিকল্প
- বেশি মাংস ও ভাজাপোড়া খাবার, ধবধবে সাদা চালের ভাত
- আলু
- পনির ও তেলতেলে খাবার
- আমাদের দেশের তথাকথিত চাইনিজ খাবার
- অতিরিক্ত লবণ
- ধূমপান
- কৌটাজাত খাবার: ইনস্ট্যান্ট স্যুপ, শাকসবজি, মাছ ও মাংস
উপকারী খাবার
- সব ধরনের মাছ। আমাদের দেশের প্রায় সব মাছই ভালো, তবে ইলিশ ও চিংড়ি একটু কম খান
- কাঁচা রসুন, হলুদ ও আদা, প্রতিদিন অল্প অল্প
- সব ধরনের বাদাম, আখরোট সবচেয়ে ভালো
- সবুজ শাকসবজি
- টক দই
- সেদ্ধ ডিম
- গ্রিন টি
- টক ফল (তেঁতুল ছাড়া)
হঠাৎ ব্যথা বেড়ে যাওয়া ঠেকাবেন কীভাবে
- কোন কোন কাজে ব্যথা বাড়ে, তা খুঁজে বের করে সচেতনভাবে এড়িয়ে চলুন
- হাঁটুকে সুরক্ষিত রাখুন: হাঁটুর ব্রেস বা হাতে লাঠি ব্যবহার করুন
- অতিরিক্ত ঠান্ডা ও গরম এড়ান, যেমন ঠান্ডা পানিতে গোসল বা সরাসরি ফ্যানের নিচে ঘুমানো
- তাড়াহুড়ো আর অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন
- দুশ্চিন্তা এড়িয়ে মন শান্ত রাখুন
- সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খান ও ব্যায়াম করুন
- ভালো আর খারাপ খাবার চিনে নিন এবং সেভাবে খান
- ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
- কখনো ভাববেন না যে একদম ভালো হয়ে গেছেন
- শুধু শুয়ে বা বসে থাকবেন না। ঘরের কাজ ও নিজের কাজ নিজে করার চেষ্টা করুন। সব কাজ একসঙ্গে না করে বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে করুন
- বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার কাজ এড়িয়ে চলুন
- শারীরিক ক্ষমতার বাইরে জোর করে কিছু করবেন না
- ওজন স্বাভাবিকের কাছাকাছি রাখুন
আর্থ্রাইটিসের ব্যথা কি সবসময় থাকে?
না। কখনো বাড়ে, কখনো কমে, কখনো একেবারেই থাকে না। তাই বলে ভাববেন না যে পুরোপুরি ভালো হয়ে গেছেন। ব্যথা বাড়া ঠেকানোর নিয়মগুলো মনে রাখুন এবং সে অনুযায়ী চলুন।
কোনো বিশেষ ভিটামিন আছে?
চিকিৎসকের পরামর্শমতো গ্লুকোজামিন (Glucosamine), ভিটামিন ডি এবং ক্যালসিয়াম খেতে পারেন।
সঠিক চিকিৎসায় কি পুরোপুরি ভালো হওয়া যায়?
রোগের প্রাথমিক অবস্থায়, কার্টিলেজ নষ্ট হওয়ার আগে সঠিক চিকিৎসা নিলে ভালো হতে পারেন। কার্টিলেজ একবার নষ্ট হলে আর নতুন করে তৈরি হয় না।
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। হাঁটুর ব্যথা বাড়লে বা ওপরের কোনো সতর্ক লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
হাঁটুতে ব্যথা থাকলে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সঠিক নিয়ম কী?
ব্যথা বেশি থাকলে সিঁড়ি ব্যবহার কমানো উচিত, তবে ব্যথা সহনীয় হলে সবসময় রেলিং ধরে এক ধাপ করে ওঠানামা করবেন। ওঠার সময় যে পায়ে ব্যথা কম সেটি আগে তুলবেন এবং নামার সময় যে পায়ে ব্যথা বেশি সেটি আগে নামাবেন।
হাঁটুর কাফ (Knee Cuff) ব্যবহারের সময় কী সতর্কতা মানতে হবে?
ভালো মানের ও সঠিক মাপের হাঁটুর কাফ পরতে হবে, খুব টাইট কাফ ব্যবহার করা যাবে না। একটানা এক ঘণ্টার বেশি কাফ পরে থাকবেন না; বেশি সময় পরার প্রয়োজন হলে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত পাঁচ মিনিট খুলে রাখুন।
ডায়াবেটিস কমানোর জন্য অতিরিক্ত হাঁটা কি হাঁটুর জন্য নিরাপদ?
না, দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিসে মাংসপেশি ও টিস্যু দুর্বল হয়ে হাঁটুর ভার বইবার ক্ষমতা কমে যায়। তাই শুধু অতিরিক্ত হেঁটে বা জোরে ব্যায়াম করে ডায়াবেটিস কমানোর চেষ্টা করলে হাঁটুর স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে; চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সঠিক ব্যায়াম করা উচিত।
এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।