হাড় ও জয়েন্ট

কিশোর বয়সে হঠাৎ খুঁড়িয়ে হাঁটা: জুভেনাইল ইডিওপ্যাথিক আর্থ্রাইটিস (JIA)

কিশোর বয়সে হঠাৎ খুঁড়িয়ে হাঁটার অনেক কারণ থাকতে পারে। তার মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ জুভেনাইল ইডিওপ্যাথিক আর্থ্রাইটিস (Juvenile Idiopathic Arthritis, সংক্ষেপে JIA)। এই লেখায় আমরা শুধু এ নিয়েই কথা বলব।

১০ থেকে ১৮ বছর বয়সকে কিশোর বয়স ধরা হয়। JIA-কে কিশোর বয়সের রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসও বলা হয়। এই বয়সে এ ধরনের আর্থ্রাইটিসই বেশি হয়। তবে আরও কম বয়সেও হতে পারে। মাত্র পাঁচ মাস বয়সেও এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। মেয়েদের মধ্যে একটু বেশি দেখা যায়।

কেন হয়

সঠিক কারণ জানা নেই। জিনের ভূমিকা থাকতে পারে বলে অনুমান করা হয়। এছাড়া কিছু সংক্রমণ এবং পরিবেশগত উপাদানও থাকতে পারে।

এটি এক ধরনের অটোইমিউন রোগ। এতে শরীরের প্রতিরক্ষা কোষ নিজের কোষ আর বাইরের জীবাণুকে আলাদা করে চিনতে পারে না। ফলে নিজের শরীরের কোষের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ শুরু করে এবং তাদের ধ্বংস করে। জয়েন্টের ভেতরের পাতলা সাইনোভিয়াল আবরণে প্রথমে প্রদাহ হয়, জয়েন্টে পানি জমে এবং জয়েন্ট ফুলে যায়।

লক্ষণ

  • ব্যথা: জয়েন্টে ব্যথা, যার কারণে খুঁড়িয়ে হাঁটা। সকালে ঘুম থেকে উঠে মেঝেতে প্রথম পা রাখার সময় ব্যথা সবচেয়ে বেশি থাকে। পরে ধীরে ধীরে কমতে পারে
  • ফোলা: বড় জয়েন্টগুলো ফুলে যায়। সব জয়েন্টই আক্রান্ত হতে পারে, সাধারণত প্রথমে হাঁটু। হাঁটু সোজা করে দাঁড়াতে পারে না
  • শক্ত ভাব: সকালে উঠে জয়েন্ট নাড়াতে শক্ত লাগে ও ব্যথা হয়। বাচ্চা কান্নাকাটি করতে পারে
  • ওজন কমা
  • জ্বর
  • খাবারে অরুচি
  • সহজে ক্লান্ত হয়ে পড়া
  • চোখে ঝাপসা দেখা, চোখ লাল হওয়া বা ব্যথা হওয়া
  • চামড়ায় লাল র‍্যাশ (ফুসকুড়ি)

এসব লক্ষণ একটি জয়েন্টে বা একসঙ্গে অনেক জয়েন্টে দেখা দিতে পারে।

সম্ভাব্য জটিলতা

সব রোগীর একই ধরনের জটিলতা হয় না, রোগীভেদে ভিন্ন হয়। সাধারণ জটিলতাগুলো:

  • রক্তশূন্যতা
  • হৃদযন্ত্রের আবরণে প্রদাহ (Pericarditis)
  • চোখে প্রদাহ (Uveitis)
  • শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়া, উচ্চতা কম থাকা
  • জয়েন্ট চিরতরে নষ্ট হয়ে যাওয়া
  • হাত ও পায়ের বৃদ্ধিতে অসামঞ্জস্য
  • মাংসপেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া, হাঁটাচলা ও হাতের কাজে দুর্বলতা
  • হাড়ের ক্ষয় (অস্টিওপোরোসিস)
  • জয়েন্ট শক্ত হয়ে বিকৃত হয়ে যাওয়া

ভবিষ্যৎ কেমন

গত বিশ বছরে এই রোগের চিকিৎসায় অনেক অগ্রগতি হয়েছে। বেশিরভাগ বাচ্চাই পরে মোটামুটি স্বাভাবিক জীবন কাটায়। কিছু বাচ্চা, যাদের প্রথমেই সব জয়েন্ট আক্রান্ত হয়, তারা বাকি জীবন মাঝে মাঝে অসুখে ভোগে। আরও অল্প কিছু বাচ্চা সারাজীবনই ভোগে।

কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন

লক্ষণ দেখা দেওয়া মাত্র অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যান। অর্থোপেডিক সার্জনের কাছে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। সময় নষ্ট করা উচিত নয়।

জয়েন্ট ফুলে গেলে এবং বাচ্চা খুঁড়িয়ে হাঁটলে ঘরে কোনো চিকিৎসা না করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসকের কাছে যান। যত আগে, তত ভালো।

জীবনযাত্রার পরিবর্তন

এই রোগের এখনো নিরাময়যোগ্য চিকিৎসা নেই, তাই এ নিয়েই ভালোভাবে বাঁচতে শিখতে হবে।

  • ব্যায়াম: চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ব্যায়াম করুন। এতে মাংসপেশি দৃঢ় হয় এবং জয়েন্টের নড়াচড়ার পরিধি বাড়ে। সাঁতার খুব ভালো ব্যায়াম, কারণ এতে জয়েন্টের ওপর আলাদা চাপ পড়ে না, অথচ মাংসপেশি শক্ত হয়
  • জয়েন্টের কর্মক্ষমতা বাড়াতে ফিজিওথেরাপিস্টের কাছে যান এবং চিকিৎসকের পরামর্শমতো ফিজিওথেরাপি নিন
  • সুষম খাবার খান
  • মাঝেমধ্যে চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করুন এবং তাঁর উপদেশ মেনে চলুন
  • স্কুল বা কলেজে যান
  • পড়াশোনার বাইরে পারিবারিক ও সামাজিক কাজে অংশ নিন
  • বড় হয়ে চাকরি করাও সম্ভব

প্রতিরোধ

যেহেতু JIA-র কারণ এখনো জানা যায়নি, তাই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় ভরসা হলো দ্রুত রোগ ধরা এবং সঠিক চিকিৎসা শুরু করা।

এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। আপনার সন্তান খুঁড়িয়ে হাঁটলে বা জয়েন্ট ফুলে গেলে দেরি না করে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যান।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

জুভেনাইল ইডিওপ্যাথিক আর্থ্রাইটিস (JIA) কেন হয় এবং কোন বয়সে দেখা যায়?

এর সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি, তবে এটি এক ধরনের অটোইমিউন রোগ যেখানে শরীরের প্রতিরক্ষা কোষ নিজের জয়েন্টের আবরণকেই আক্রমণ করে প্রদাহ ও ফোলা তৈরি করে। সাধারণত ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সে এটি বেশি হলেও মাত্র পাঁচ মাস বয়সেও হতে পারে এবং মেয়েদের মধ্যে কিছুটা বেশি দেখা যায়।

বাচ্চার জয়েন্ট ফুলে গেলে ও খুঁড়িয়ে হাঁটলে অভিভাবকদের কী করা উচিত?

জয়েন্ট ফুলে গেলে এবং বাচ্চা খুঁড়িয়ে হাঁটলে ঘরে কোনো চিকিৎসা করে সময় নষ্ট না করে যত দ্রুত সম্ভব অভিজ্ঞ চিকিৎসক বা অর্থোপেডিক সার্জনের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত। কারণ রোগটি প্রতিরোধের উপায় না থাকায় দ্রুত রোগ নির্ণয় ও সঠিক চিকিৎসা শুরু করাই সবচেয়ে বড় ভরসা।

JIA আক্রান্ত শিশুদের জন্য কোন ব্যায়াম সবচেয়ে উপকারী?

চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ব্যায়াম ও ফিজিওথেরাপি করলে মাংসপেশি দৃঢ় হয় এবং জয়েন্টের কর্মক্ষমতা বাড়ে। বিশেষ করে সাঁতার খুব ভালো ব্যায়াম, কারণ এতে জয়েন্টের ওপর আলাদা চাপ না ফেলেই মাংসপেশি শক্ত হয়।

এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

আরও পড়ুন

সব প্রবন্ধ
হাড় ও জয়েন্টArthritis

আর্থ্রাইটিস: জয়েন্টের ব্যথা, প্রদাহ আর সুস্থ থাকার সহজ পথ

আর্থ্রাইটিস বা জয়েন্টের প্রদাহ কেন হয় ও কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন? সঠিক চিকিৎসা, খাবার ও ব্যায়ামে ব্যথা কমিয়ে ভালো থাকার উপায় জানুন।

পড়ুন · ৭ মিনিট
হাড় ও জয়েন্টFrozen Shoulder

ফ্রোজেন শোল্ডার: কাঁধ শক্ত হয়ে গেলে কী করবেন

কাঁধের জয়েন্ট শক্ত হয়ে হাত নাড়াতে কষ্ট হওয়াকে ফ্রোজেন শোল্ডার বলে। সঠিক ব্যায়াম, গরম সেঁক ও চিকিৎসায় প্রায় ৯০ শতাংশ রোগীই ভালো হয়ে যান।

পড়ুন · ৪ মিনিট
হাড় ও জয়েন্টHip Joint Pain

নিতম্বের জয়েন্টে ব্যথা (হিপ পেইন): কারণ, লক্ষণ ও করণীয়

নিতম্ব বা উরুর ওপরের ব্যথা আসলেই হিপ জয়েন্ট থেকে আসছে, নাকি মেরুদণ্ড থেকে—তা বোঝা জরুরি। হিপ পেইনের কারণ, শোয়ার নিয়ম ও চিকিৎসার পরামর্শ জানুন।

পড়ুন · ৫ মিনিট