জীবনে একবারও পায়ের পাতা বা গোড়ালিতে ব্যথা হয়নি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। গোড়ালির ব্যথা প্রায় সার্বজনীন সমস্যা।
আমরা প্রতি মাইল হাঁটতে গেলে প্রতিটি পায়ে প্রায় ৩০ টন ওজনের সমান চাপ দিই। শক্ত জুতা বা চপ্পল পরলে, কিংবা শক্ত জায়গায় খালি পায়ে হাঁটলে এই চাপ আরও বাড়ে, কারণ চাপ স্বাভাবিকভাবে ছড়িয়ে না গিয়ে এক জায়গায় আটকে থাকে। ডায়াবেটিস থাকলে পায়ের তলার চর্বির কুশন দ্রুত শুকিয়ে যায়, ফলে চাপ আরও বেশি লাগে।
সাধারণত গোড়ালির নিচে বা পেছনে ব্যথা শুরু হয়, কখনো পাশেও। বেশিরভাগ রোগী গোড়ালির নিচের দিকের ব্যথা নিয়েই আসেন। আঘাত ছাড়াই ব্যথা শুরু হয়। প্রথমে সহনীয় থাকে এবং অনেক সময় নিজে নিজেই সেরে যায়। কিন্তু কখনো ব্যথা বাড়তে বাড়তে অসহনীয় হয়ে ওঠে এবং প্রতিদিনের কাজে বাধা দেয়।
পায়ের গঠন একনজরে
পা তৈরি হয়েছে ২৮টি হাড়, ৩০টি জয়েন্ট, অনেক রগ ও লিগামেন্ট, কয়েকটি বার্সা (Bursa), মাংসপেশি, স্নায়ু এবং বিশেষ গঠনের চামড়া দিয়ে। এর ওপর শরীরের সব ওজন দিয়ে আমরা নিশ্চিন্তে চলাফেরা করি, যতক্ষণ না কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গোড়ালির হাড়ের নাম ক্যালক্যানিয়াস (Calcaneus)। পায়ের তলায় আছে প্ল্যান্টার ফ্যাসিয়া (Plantar Fascia) নামে শক্ত দড়ির মতো এক টিস্যু, যা ধনুকের ছিলার মতো গোড়ালির হাড়কে আঙুলের হাড়ের সঙ্গে ধরে রাখে। এর কল্যাণেই আমাদের পা স্প্রিংয়ের মতো কাজ করে আর হাঁটার সময় ঝাঁকুনি লাগে না।
প্ল্যান্টার ফ্যাসিয়া যেখানে গোড়ালির হাড়ে আটকানো, সেখানকার প্রদাহই গোড়ালির ব্যথার প্রধান কারণ। এছাড়া পায়ের পেছনের বড় রগ, অ্যাকিলিস টেন্ডন (Achilles Tendon), গোড়ালির হাড়ের পেছনে আটকানো। এর প্রদাহও গোড়ালির ব্যথার বড় একটি কারণ। এই লেখায় মূলত প্ল্যান্টার ফ্যাসিয়ার প্রদাহ নিয়েই কথা হবে।
প্রদাহ অনেকদিন থাকলে সেখানে ক্যালসিয়াম লবণ জমে। এক্সরে করলে তখন ছোট টিউমারের মতো একটি কাঁটা (স্পার, Spur) দেখা যায়।
গোড়ালির ব্যথার কারণ
- প্ল্যান্টার ফ্যাসিয়ার প্রদাহ। কোনো কারণ ছাড়াই শুরু হতে পারে। যাঁদের রিউমাটয়েড রোগ আছে, তাঁদের ব্যথা আরও তীব্র হতে পারে
- অ্যাকিলিস রগের প্রদাহ
- খালি পায়ে হাঁটা
- শক্ত চটি বা চপ্পল পরা
- অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস
- হঠাৎ অনেক বেশি হাঁটা, দৌড়ানো বা লাফানো, এমনকি বাচ্চাদেরও এ কারণে ব্যথা হতে পারে
- পায়ের হাড় ভাঙা, হাড় বা অন্য টিস্যুর টিউমার (বিরল)
- গোড়ালির কোনো টিস্যু ছিঁড়ে যাওয়া
- গোড়ালির কুশন পাতলা হয়ে যাওয়া
- গোড়ালির হাড়ে ছোট গুটির মতো উঁচু অংশ হওয়া, যার সঙ্গে বারবার ঘষা লেগে প্রদাহ হয়
- বার্সার প্রদাহ
- হাড়ের ইনফেকশন
- পায়ের তলার স্নায়ুতে চাপ বা রক্তনালীর সমস্যা
ডায়াবেটিস (নিয়ন্ত্রিত হোক বা অনিয়ন্ত্রিত) বা রিউমাটয়েড রোগ থাকলে ব্যথার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
গোড়ালির কুশন কেন পাতলা হয়
গোড়ালির নিচে পুরু চর্বির একটি কুশন থাকে, গদির মতো। এটি হাড়ের সঙ্গে চামড়ার ঘষা ঠেকায় আর শরীরের ওজন পুরো পায়ে ছড়িয়ে দেয়। এই কুশন পাতলা হয়ে গেলে হাড়ের সঙ্গে রগ ও লিগামেন্টের সরাসরি ঘষা লাগে, ফলে প্রদাহ হয়। কুশন পাতলা হওয়ার কারণ:
- অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস
- ওজন বেড়ে যাওয়া
- শক্ত জুতা পরা
- ঠিক মাপের জুতা না পরা
পায়ের গঠনের কারণে ব্যথা
- সমতল পা (Flat Foot): স্বাভাবিকভাবে পায়ের ভেতরের দিকে একটু উঁচু খিলান থাকে, তাই ভেতরের ধার মাটি ছোঁয় না। সমতল পায়ে এই খিলান নষ্ট হয়ে যায় এবং ভেতরের ধার দিয়ে হাঁটতে হয়। এতে প্ল্যান্টার ফ্যাসিয়া বেশি চাপে পড়ে, হাঁটার ভারসাম্য নষ্ট হয়, প্রদাহ হয়ে ব্যথা শুরু হয়।
- অতি উঁচু খিলান (High Arched Foot): এতেও ওজনের চাপ পায়ের পাতায় সমানভাবে ভাগ হয় না, ভারসাম্য নষ্ট হয়, প্রদাহ ও ব্যথা হয়।
গোড়ালির ব্যথার লক্ষণ
- ব্যথা ধীরে ধীরে শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে বাড়ে
- সাধারণত কোনো সরাসরি আঘাতের ঘটনা থাকে না
- সকালে ঘুম থেকে উঠে মেঝেতে প্রথম পা রাখতেই সবচেয়ে বেশি ব্যথা। কিছুক্ষণ হাঁটলে একটু কমতে পারে
- অন্য সময়ও কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর হাঁটা শুরু করলে ব্যথা বেশি
- শক্ত ও পাতলা (ফ্ল্যাট) চটি বা জুতায় ব্যথা বেশি
- গোড়ালি একটু উঁচু জুতা বা চপ্পলে ব্যথা কমে
ব্যথা প্রতিরোধের উপায়
লক্ষ্য একটাই: গোড়ালির ওপর চাপ কমানো।
- কখনো খালি পায়ে হাঁটবেন না। নরম সোলের জুতা বা চপ্পল পরুন
- ওজন স্বাভাবিকের কাছাকাছি রাখুন
- ডায়াবেটিস অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে রাখুন
- জুতার ভেতরে নরম সোল (Insole) ব্যবহার করুন, আলাদাভাবে কিনতে পাওয়া যায়
- যে জুতা পরলে ব্যথা শুরু হয়, তা বাদ দিন
- ঠিক মাপের জুতা পরুন। হিলওয়ালা জুতা বেশি উপকারী, ফ্ল্যাট জুতা নয়
- সোল ক্ষয়ে গেলে বা ছিঁড়ে গেলে জুতা বদলান
- গোড়ালিতে বারবার ব্যথা হলে যথাসম্ভব দাঁড়িয়ে থাকার কাজ এড়িয়ে চলুন
- খেলোয়াড়েরা খেলার আগে অবশ্যই ওয়ার্ম আপ করে নিন
- কাজ ও খেলার ধরন অনুযায়ী জুতা পরুন
- ব্যথা শুরু হলেই সময় নষ্ট না করে চিকিৎসা নিন। ব্যথা নিয়ে জোর করে হাঁটলে পরে চিকিৎসা নিয়েও সারতে বেশি সময় লাগে
- "পা-ই তো" বলে হেলা করবেন না
ঘরে সাধারণ চিকিৎসা
- বিশ্রাম ও সাধারণ ব্যথার ওষুধ
- গরম সেঁক
- নরম জুতা বা চপ্পল
- জুতায় অন্তত এক ইঞ্চি পুরু নরম সোল
- গোড়ালি একটু উঁচু জুতা
- পায়ের পেছন দিক খোলা জুতা ব্যবহারেও উপকার মেলে
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
- সরাসরি আঘাতের কারণে ব্যথা হলে
- সাধারণ চিকিৎসায় ব্যথা না কমলে
- গোড়ালিতে প্রচণ্ড ব্যথা, ফোলা বা চামড়া লাল হলে
- ব্যথার সঙ্গে জ্বর থাকলে
- গোড়ালিতে অবশ ভাব ও কাঁটা কাঁটা অনুভূতি থাকলে
- ব্যথার কারণে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে না পারলে
- সাধারণত মানুষ পায়ের আঙুলের ওপর ভর করে কিছুদূর হাঁটতে পারে। তা না পারলে
- এক সপ্তাহের বেশি ব্যথা থাকলে
- রাতে বিছানায় শোয়ার পরও ব্যথা থাকলে এবং ঘুমের ব্যাঘাত হলে
প্রশ্ন ও উত্তর
ব্যথা নিয়ে কি স্বাভাবিকভাবে হাঁটব?
হ্যাঁ, হাঁটুন। যদিও প্ল্যান্টার ফ্যাসিয়ার প্রদাহে প্রধান সমস্যাই হাঁটার সময় ব্যথা, তবু হাঁটাহাঁটিই এ রোগের প্রধান ব্যায়াম। হাঁটার আগে পায়ের মাংসপেশি টান টান করার ব্যায়াম (স্ট্রেচিং) করে নিন, চিকিৎসকের কাছ থেকে শিখে নেবেন। সঙ্গে:
- পায়ের তলায় মৃদু গরম সেঁক দিতে পারেন
- সাধারণ ব্যথার ওষুধ খান
- নরম সোলের জুতা বা চপ্পল পরুন
- কোনো অবস্থাতেই খালি পায়ে হাঁটবেন না
গোড়ালির ব্যথা কি আপনা আপনি ভালো হয়?
হ্যাঁ, ঘরের সাধারণ চিকিৎসায় অনেক সময় ভালো হয়ে যায়। তবে শুরুতেই চিকিৎসা নিতে হবে। শুরুতে হেলা করলে বা দেরি করলে সহজে সারে না, দিন দিন খারাপ হয়। স্ট্রেচিং ব্যায়াম খুব উপকারী। পুরোপুরি ভালো হতে সাধারণত দুই থেকে তিন সপ্তাহ লাগে, কখনো চার থেকে ছয় সপ্তাহও।
গরম নাকি ঠান্ডা সেঁক?
খুব ব্যথা থাকলে আগে ঠান্ডা সেঁক। সেঁকের নিয়ম চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন। অল্প ব্যথায় মৃদু গরম সেঁক বা হিটিং প্যাড ব্যবহার করতে পারেন। তবে গরম সেঁকে অনেক সময় ব্যথা বাড়েও।
চিকিৎসা না নিলে কী হয়?
প্রদাহের কারণে অনেক কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিছু ছিঁড়ে যায়। যেগুলো ছেঁড়ে না, সেগুলো মোটা হয়ে যায় এবং তাতে ক্যালসিয়াম লবণ জমে গুটি গুটি হয়ে যায়। এই পরিবর্তনগুলো স্থায়ী হয়, প্রদাহও স্থায়ী হয়ে যায়। তখন স্বাভাবিক হাঁটাচলা ও প্রতিদিনের কাজ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। ব্যথা এক সপ্তাহের বেশি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সকালে ঘুম থেকে উঠে মেঝেতে পা রাখলেই গোড়ালিতে বেশি ব্যথা হয় কেন?
পায়ের তলার প্ল্যান্টার ফ্যাসিয়া যেখানে গোড়ালির হাড়ে আটকানো থাকে, সেখানে প্রদাহ হলে সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম পা রাখতেই সবচেয়ে বেশি ব্যথা লাগে। অন্য সময়েও কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর হাঁটা শুরু করলে ব্যথা বাড়ে এবং কিছুক্ষণ হাঁটলে কিছুটা কমতে পারে।
গোড়ালির ব্যথা কমাতে কেমন জুতা বা চপ্পল পরা উচিত?
কখনোই খালি পায়ে হাঁটা যাবে না এবং শক্ত ও পাতলা ফ্ল্যাট চটি এড়িয়ে চলতে হবে। জুতায় অন্তত এক ইঞ্চি পুরু নরম সোল বা ইনসোল থাকা এবং গোড়ালি একটু উঁচু জুতা বা চপ্পল পরা উপকারী।
গোড়ালির ব্যথা ভালো হতে সাধারণত কতদিন সময় লাগে?
শুরুতেই ঘরের সাধারণ চিকিৎসা ও চিকিৎসকের শেখানো স্ট্রেচিং ব্যায়াম করলে সাধারণত দুই থেকে তিন সপ্তাহে, কখনো চার থেকে ছয় সপ্তাহে ব্যথা ভালো হয়ে যায়। তবে শুরুতে অবহেলা করলে প্রদাহ স্থায়ী হয়ে সারতে অনেক বেশি সময় লাগতে পারে।
এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।