হাত আমাদের শরীরের এক বিস্ময়কর অঙ্গ। কব্জি থেকে আঙুলের ডগা পর্যন্ত পুরোটাকে আমরা হাত বলি। হাত দিয়ে আমরা লিখি, সেতার বাজাই, ছবি আঁকি, আবার ভারী জিনিসও তোলার চেষ্টা করি। তাই হাতকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ যন্ত্রও বলা হয়।
একটি হাত তৈরি হতে লাগে ২৭টি হাড়, মাংসপেশি, রগ (Tendon), লিগামেন্ট, স্নায়ু, রক্তনালী এবং বিশেষ গঠনের চামড়া। এতগুলো টিস্যুর যে কোনো একটির সমস্যাই হাতের ব্যথার কারণ হতে পারে। এ কারণে অনেক অর্থোপেডিক সার্জন সারাজীবন শুধু হাতের সমস্যা নিয়েই কাজ করেন।
হাতের ব্যথা কেন হয়
- হাতের অতিরিক্ত ব্যবহার, ভারী জিনিস তোলা
- বারবার একই ধরনের কাজ করা
- হাতে সরাসরি আঘাত লাগা
- হাত মচকে যাওয়া বা হাড় ভেঙে যাওয়া
- হাতের যে কোনো টিস্যুর প্রদাহ বা ইনফেকশন
- স্নায়ু বা রক্তনালী কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
- হাতের জয়েন্টে অস্টিওআর্থ্রাইটিস
- ঘাড় ও মেরুদণ্ডের অনেক সমস্যাতেও হাতে ব্যথা হতে পারে
- সারা শরীরের কিছু রোগ, যেমন রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, হাতেও লক্ষণ দেখাতে পারে
- মস্তিষ্কের কোনো কোনো রোগে হাতে ব্যথা, অবশ ভাব ও শক্তি কমে যেতে পারে
লক্ষণ
আঘাতের পর হোক বা আঘাত ছাড়াই:
- হাত ফুলে যাওয়া, টিপ দিলে ব্যথা লাগা
- কব্জি থেকে আঙুলের মাথা পর্যন্ত ব্যথা
- জ্বর
- হাতের চামড়া লাল বা ফ্যাকাশে হওয়া
- আঙুল নাড়াতে ও প্রতিদিনের কাজ করতে কষ্ট হওয়া
- হাতে জোর না পাওয়া, অবশ ভাব
- বারবার ঝিমঝিম বা কাঁটা কাঁটা লাগা
- হাতের ব্যথার সঙ্গে মাথাব্যথা ও ঘাড়ে ব্যথা
সাধারণ চিকিৎসা
আঘাতের পর হাতে ব্যথা হলে সরাসরি চিকিৎসকের কাছে যাওয়াই ভালো। আর অতিরিক্ত কাজের কারণে সাধারণ ব্যথা মনে হলে:
- হাতকে বিশ্রামে রাখুন, তবে কষ্ট হলেও আঙুল নাড়ানো যথাসম্ভব চালু রাখুন
- চিকিৎসকের পরামর্শমতো স্প্লিন্ট (Splint) ব্যবহার করুন
- ব্যথার সাধারণ ওষুধ খান
- গরম বা ঠান্ডা সেঁক দিন
- হাত ফুলে গেলে হাত উঁচু করে রাখুন এবং আঙুল নাড়াতে পারলে নাড়ান
মূল কথা, ব্যথা, ফোলা বা আঘাত পেলে চিকিৎসকের কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন যে হাতে বড় কোনো ক্ষতি হয়নি।
কখন ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন
- কোনো আঘাতের পর ব্যথা হলে
- ব্যথা ধীরে ধীরে শুরু হয়ে ক্রমশ বাড়তে থাকলে
- বাইরের কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ হাতে ব্যথা, অবশ ভাব ও বমি হলে, এ অবস্থায় অতি দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান
- হাতে কাঁটা কাঁটা লাগার সঙ্গে মাথাব্যথা থাকলে
- ব্যথার সঙ্গে জ্বর, ফোলা, চামড়া লাল বা ফ্যাকাশে হলে
- হাতের স্বাভাবিক আকার বদলে গেলে
- আঙুল নাড়াতে কষ্ট হলে
- হাত অবশ হয়ে গেলে
- সাধারণ চিকিৎসায় ব্যথা বা অন্য লক্ষণ না কমলে
- হাতের ব্যথার সঙ্গে ঘাড় বা মাথায় ব্যথা এবং বমি বমি ভাব থাকলে
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। হাতের ব্যথা দীর্ঘদিন থাকলে বা বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
অতিরিক্ত কাজের কারণে হাতে সাধারণ ব্যথা হলে ঘরে কী করবেন?
হাতকে বিশ্রামে রাখুন, তবে কষ্ট হলেও আঙুল নাড়ানো যথাসম্ভব চালু রাখুন এবং হাত ফুলে গেলে উঁচু করে রাখুন। পাশাপাশি গরম বা ঠান্ডা সেঁক দেওয়া, সাধারণ ব্যথার ওষুধ খাওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শমতো স্প্লিন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে।
হাতের ব্যথার সঙ্গে কোন লক্ষণগুলো দেখা দিলে অতি দ্রুত ডাক্তারের কাছে যেতে হবে?
বাইরের কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ হাতে ব্যথা, অবশ ভাব ও বমি হলে অতি দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। এছাড়া হাতের ব্যথার সঙ্গে ঘাড় বা মাথায় ব্যথা, বমি বমি ভাব, জ্বর, চামড়া লাল বা ফ্যাকাশে হওয়া কিংবা হাতের স্বাভাবিক আকার বদলে গেলেও দ্রুত পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শুধু হাতের সমস্যাই কি হাতের ব্যথার একমাত্র কারণ?
না, হাতের হাড়, রগ বা জয়েন্টের সমস্যা ছাড়াও ঘাড় ও মেরুদণ্ডের অনেক সমস্যায় হাতে ব্যথা হতে পারে। এছাড়া রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো সারা শরীরের রোগ এবং মস্তিষ্কের কিছু রোগেও হাতে ব্যথা, অবশ ভাব ও শক্তি কমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।