সার্জনরা হাতের আঙুলকে পৃথিবীর সেরা যন্ত্র বলেন। হাত দিয়ে যা কিছু করি, সবই আঙুলের মাধ্যমে। একটি আঙুলের সমস্যাতেই পুরো হাত অকেজো হয়ে যেতে পারে। হাতের পুরো কাজ যদি ১০০ ধরা হয়, তাহলে একা বুড়ো আঙুলই করে ৬০ ভাগ, বাকি চার আঙুল মিলে ৪০ ভাগ। তাই বলা হয়, বুড়ো আঙুল না থাকা মানে প্রায় পুরো হাতটাই না থাকা।
আঙুলের নড়াচড়া খুব জটিল প্রক্রিয়া। জামার বোতাম লাগানোর কথাই ভাবুন। সাধারণ সময় খেয়ালই করি না। কিন্তু কোনো আঙুলের স্নায়ু, মাংসপেশি বা রগ নষ্ট হলে বোঝা যায়, একটা বোতাম লাগানো কত কঠিন কাজ।
আঙুলের গঠন
প্রতিটি আঙুলে সাধারণত থাকে তিনটি হাড়, তিনটি জয়েন্ট, কয়েকটি মাংসপেশি ও রগ, তিনটি স্নায়ু এবং অনেক লিগামেন্ট। কমপক্ষে দুটি স্নায়ু কাজ করে, কোথাও তিনটিও। এর সঙ্গে আছে রক্তনালী। এর যে কোনোটির অসুখ হলে পুরো আঙুল, এমনকি পুরো হাত অকেজো হয়ে পড়তে পারে।
ব্যথার কারণ
- সরাসরি আঘাত: হাড় ভাঙা, থেঁতলে যাওয়া, কেটে যাওয়া, ছিঁড়ে যাওয়া
- আঘাত ছাড়াই আঙুলে ইনফেকশন
- বিভিন্ন প্রদাহজনিত ব্যথা, যেমন রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ও অস্টিওআর্থ্রাইটিস
- শরীরের অনেক অসুখেই আঙুল আক্রান্ত হতে পারে
- কনুইয়ের কাছে রগের প্রদাহ
- কব্জি বা কনুইয়ের কাছে স্নায়ুতে চাপ
- ঘাড় ও মেরুদণ্ডের অনেক রোগে আঙুলে ব্যথা, ঝিমঝিম বা কাঁটা কাঁটা অনুভূতি
- মস্তিষ্কের বিভিন্ন অসুখে আঙুলে ব্যথা ও দুর্বলতা
লক্ষণ
সরাসরি আঘাত ছাড়াই:
- আঙুলে ব্যথা
- ফুলে যাওয়া, গরম হওয়া, লাল হয়ে যাওয়া
- আঙুল অবশ হওয়া
- কাঁটা কাঁটা ও ঝিমঝিম অনুভূতি
- জয়েন্ট নাড়াতে না পারা, জয়েন্ট ফুলে যাওয়া
- ব্যথার কারণে ঘুম ভেঙে যাওয়া
সকালে ঘুম থেকে উঠে আঙুলের জয়েন্ট আড়ষ্ট হয়ে থাকা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের একটি প্রাথমিক লক্ষণ। আঘাতের পরও এই লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে।
ঘরোয়া চিকিৎসা
আঙুলে সাধারণ মচকানোর (Strain বা Sprain) ব্যথা ঘরে সামলানো যায়:
- সাধারণ ব্যথার ওষুধ খান
- দুই থেকে তিন দিন আঙুল না নাড়ান। কিন্তু মনে রাখবেন, পাঁচ দিনের বেশি আঙুল নাড়ানো বন্ধ রাখলে জয়েন্ট চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে
- আঙুল ফুলে গেলে হাত উঁচু করে রাখুন
- যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আঙুল আবার নাড়ানো শুরু করুন
- ঠান্ডা বা গরম সেঁক দেওয়া যাবে
- ব্যথা কমানোর জন্য আঙুলে মালিশ করবেন না
তবে যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তার দেখানোই ভালো।
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
বড় কোনো আঘাতের পর ব্যথা হলে সরাসরি ডাক্তারের কাছে যান। এছাড়া:
- আঘাত ছাড়াই প্রচণ্ড ব্যথা, সাধারণ ওষুধে কাজ না হওয়া, ব্যথা বা ফোলা দিন দিন বাড়া
- আঙুল ফোলা, চামড়া লাল ও জ্বর থাকলে, যত দ্রুত সম্ভব
- আঙুল অবশ হলে, কাঁটা কাঁটা বা ঝিমঝিম লাগলে
- আঙুলের জয়েন্ট নাড়াতে না পারলে
- আঙুল কালো বা ফ্যাকাশে হতে থাকলে
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। আঙুলে ব্যথা ও ফোলা দীর্ঘদিন থাকলে বা বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সকালে ঘুম থেকে উঠে হাতের আঙুলের জয়েন্ট শক্ত হয়ে থাকে কেন?
সকালে ঘুম থেকে উঠে আঙুলের জয়েন্ট আড়ষ্ট বা শক্ত হয়ে থাকা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের একটি প্রাথমিক লক্ষণ। এছাড়া আঘাতের পরও আঙুলে ব্যথা ও জয়েন্টের এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে।
আঙুল মচকে গেলে ঘরে কী ধরনের যত্ন নেওয়া যায়?
সাধারণ মচকানোয় ব্যথার সাধারণ ওষুধ খাওয়া, ঠান্ডা বা গরম সেঁক দেওয়া এবং আঙুল ফুলে গেলে হাত উঁচু করে রাখা যায়। দুই থেকে তিন দিন আঙুল বিশ্রামে রাখা গেলেও পাঁচ দিনের বেশি নাড়ানো বন্ধ রাখা যাবে না, কারণ তাতে জয়েন্ট চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে; আর ব্যথা কমাতে আঙুলে মালিশ করবেন না।
ঘাড় বা কব্জির সমস্যার কারণেও কি হাতের আঙুলে ব্যথা হতে পারে?
হ্যাঁ, কব্জি বা কনুইয়ের কাছে স্নায়ুতে চাপ পড়লে কিংবা কনুইয়ের কাছে রগের প্রদাহ হলে আঙুলে ব্যথা হতে পারে। পাশাপাশি ঘাড় ও মেরুদণ্ডের অনেক রোগেও আঙুলে ব্যথা, ঝিমঝিম বা কাঁটা কাঁটা অনুভূতি দেখা দেয়।
এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।