ডায়াবেটিসে পায়ের ক্ষতি নীরবে হয়। এই লেখায় রোগীদের সবচেয়ে বেশি করা প্রশ্নগুলোর সহজ উত্তর দেওয়া হলো।
ওজন বেশি হলে কি ডায়াবেটিসের ক্ষতি হয়
অবশ্যই। চর্বি যত বেশি, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ তত কঠিন। বেশি ওজন মানে নিতম্বের জয়েন্ট, হাঁটু, পায়ের গিঁট ও পায়ের পাতায় বেশি চাপ। জয়েন্ট ধীরে ধীরে নষ্ট হয়, ব্যথা বাড়ে এবং পায়ে ঘা হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।
ডাক্তার আমার পা পরীক্ষা করেন না। কী করব
ডাক্তারের চেম্বারে ঢোকার আগে জুতা মোজা খুলে শুধু চপ্পল পায়ে দিন। চপ্পল পায়েই ঢুকে বিনয়ের সঙ্গে পা পরীক্ষা করতে অনুরোধ করুন।
ডায়াবেটিস হলে কি সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি
হ্যাঁ। কারণ:
- ডায়াবেটিস শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কমিয়ে দেয়
- চামড়া শুকিয়ে সূক্ষ্ম ফাটল ধরে, সেই পথে জীবাণু ঢোকে
- রক্তে বাড়তি চিনি জীবাণুর খুব পছন্দ। তারা তা খেয়ে দ্রুত বংশ বাড়ায়
কেমন মোজা পরবেন
- সুতি বা উলের মোজা পরা যায়
- মোজা ছাড়া জুতা বা চপ্পল পরবেন না
- খুব টাইট বা খুব ঢিলা মোজা নয়
- মোজা কুঁচকে থাকবে না, ঠিকভাবে লেগে থাকবে
- সিম (seam) ছাড়া মোজা নিরাপদ। সিম মানে মোজার ভেতরের মোটা সেলাইয়ের অংশ
- ওপরের দিকে টাইট ইলাস্টিক থাকলে কেটে নিন
- পায়ের আকারের মোজা ভালো, টিউব আকারের নয়
- তালি দেওয়া বা সেলাই করা মোজা ব্যবহার করবেন না
- নাইলনের মোজা নয়
- ডায়াবেটিস রোগীর জন্য বিশেষ মোজা কিনতে পাওয়া যায়
পায়ের বুড়ো আঙুলে হোঁচট খেলে কী করব
এটি নির্ভর করে আঘাত কতটা তার ওপর। সামান্য আঘাতে সাধারণ ব্যথার ওষুধই যথেষ্ট। আগে থেকে পায়ে ব্যথা না থাকলে বরফের ব্যাগ দেওয়া যায়। পা উঁচু করে শুয়ে থাকলেও উপকার হয়। তাতে কাজ না হলে বা বেশি ফুলে গেলে ডাক্তার দেখান এবং এক্স-রে করে দেখুন কোনো হাড় ভেঙেছে কি না।
নখের নিচে রক্ত জমলে চাপ কমাতে সেই রক্ত বের করতে হয়। নিজে বের করবেন না, চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ডায়াবেটিসের রোগীদের স্নায়ু নষ্ট হওয়ায় পায়ে অনুভূতি কম থাকে। হোঁচটের ব্যথা টের না-ও পেতে পারেন। তাই ডায়াবেটিস থাকলে পায়ে যে কোনো আঘাত লাগলেই চিকিৎসকের কাছে যান।
পায়ের চামড়া পাতলা ও শুকনো লাগছে কেন
- বয়স বাড়লে এবং ডায়াবেটিস হলে চামড়ার নিচের চর্বি শুকিয়ে যায়, ফলে চামড়া পাতলা মনে হয়
- বারবার ধোয়া বা বেশি ক্ষারযুক্ত সাবান ব্যবহারে চামড়ার স্বাভাবিক তেল চলে যায়
- স্নায়ুর ক্ষতির কারণে পায়ে রক্ত চলাচল, ঘাম ও আর্দ্রতা কমে যায়
চিকিৎসকের পরামর্শে ময়শ্চারাইজিং লোশন ব্যবহার করুন। দুই আঙুলের ফাঁকে লোশন লাগাবেন না। রাতে ঘুমানোর আগে লোশন লাগিয়ে মোজা পরে ঘুমানো সবচেয়ে ভালো।
জুতা কতদিন পরপর পরীক্ষা করব
প্রতিবার পরার আগে। জুতার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দেখুন পিন, ধারালো কিছু, ইটের টুকরা, বা পায়ে ঘষা লাগার মতো কিছু ঢুকেছে কি না। হঠাৎ কোনো অনুষ্ঠানের জন্য নতুন জুতা পরে বেরোবেন না।
পা ভালো দেখতে পাই না। নিজে কীভাবে পরীক্ষা করব
চেয়ারে আরাম করে বসুন। এক পা হাঁটুর ওপর বা অন্য চেয়ারের ওপর তুলুন। হাতে একটি আয়না নিন। পর্যাপ্ত আলোতে সরাসরি এবং আয়নায় ভালো করে দেখুন। প্রতিদিন নিজেকেই পা দুটো পরীক্ষা করতে হবে। দুই আঙুলের ফাঁক বিশেষভাবে দেখুন।
বারবার পা ধোয়া কি ভালো
না। দিনে একবার ভালো করে ধোয়াই স্বাস্থ্যসম্মত। মৃদু গরম পানি ও গোসলের সাবান দিয়ে ধুয়ে ভালো করে শুকিয়ে নিন, বিশেষ করে আঙুলের ফাঁক। বারবার ধুলে চামড়ার স্বাভাবিক তেল চলে গিয়ে চামড়া শুকিয়ে ফেটে যায় এবং ঘা হয়, যা খুবই মারাত্মক।
ঘরে কার্পেট পাতা, খালি পায়ে হাঁটা যাবে কি
না, অবশ্যই না। কার্পেটে আলপিন, ছোট পেরেক, খেলনার টুকরা বা মাছের কাঁটা থাকতে পারে। ঘরে পরার চপ্পল পরুন। শুধু রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় চপ্পল খুলুন, অন্য সবসময় পায়ে থাকবে।
জুতার ভেতরে আলাদা নরম সোল (Insole) ভালো কি
হ্যাঁ। নরম সোলে পায়ের তলায় চাপ কম পড়ে। পায়ের তলার চামড়া পাতলা হয়ে গেলে বা কোথাও অস্বাভাবিক মোটা চামড়া থাকলে আলাদা নরম সোল ব্যবহার করা উচিত। সাধারণত সেই মোটা চামড়ার জায়গায় কড়া (Callus) জমে, আর কড়ার নিচেই ঘা শুরু হয়। কড়া ঠেকাতে পারলে ঘা-ও ঠেকে। বাজারে নানা ধরনের নরম সোল পাওয়া যায়।
পায়ের তলায় তারকাটা ফুটলে কী করব
ডায়াবেটিসের রোগীর জন্য এটি খুব মারাত্মক, বিশেষ করে পায়ে আগে থেকে ব্যথা বা অবশ ভাব থাকলে। তারকাটায় মরিচা থাকুক বা না থাকুক। জুতার তারকাটা হলে আরও ভয়ের, কারণ রাবারের ক্ষুদ্র টুকরা চামড়ার ভেতরে ঢুকে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
- মৃদু গরম পানি ও সাবান দিয়ে স্থানটি তাড়াতাড়ি ধুয়ে ফেলুন
- ভালো করে শুকিয়ে ব্যান্ডেজ লাগান
- যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসকের কাছে যান
পায়ে ঘা হওয়ার সম্ভাবনা কতটা
যাঁদের দশ বছরের বেশি ডায়াবেটিস আছে, তাঁদের প্রায় অর্ধেকের কোনো না কোনো মাত্রায় স্নায়ু নষ্ট হয়েছে। অর্থাৎ পায়ের অনুভূতি ও শক্তি কমে গেছে, রক্ত চলাচলও কমেছে। এই দুইয়ে মিলে ঘা হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
১৫ থেকে ২৫ ভাগ মানুষ জীবনে অন্তত একবার পায়ের ঘায়ে ভোগেন। এঁদের প্রায় ৭০ ভাগ ঠিকমতো নিয়ম মেনে চিকিৎসা নিয়ে সেরে ওঠেন। প্রায় ১০ ভাগের পায়ের কোনো না কোনো অংশ কেটে ফেলতে হয়। একবার ঘা হলে আবার হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
হঠাৎ পায়ে ফোস্কা উঠলে কী করব
ফোস্কা মানেই সংক্রমণ নয়, কিন্তু সংক্রমণ হওয়ার অপেক্ষায় থাকাও ঠিক নয়। জুতার কোনো অংশের বারবার ঘষা লেগে ফোস্কা ওঠে।
- ফোস্কা ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেই জুতা পরা বন্ধ করুন এবং চিকিৎসকের কাছে যান
- পায়ে আগে থেকে অবশ জায়গা বা ব্যথা থাকলে আরও গুরুত্ব দিন
- ফোস্কা নিজে ফাটাবেন না। শুকনো ব্যান্ডেজে ঢেকে দিন
- নিজে ফেটে গেলে ওপরের চামড়াটুকু দিয়ে ক্ষত ঢেকে ব্যান্ডেজ দিন, তারপর চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন
- নতুন জুতা পরলে কিছুক্ষণ হাঁটার পর পা দেখুন, কোথাও লাল হয়েছে কি না। হলে সেই জায়গায় আলাদা প্যাড দিন বা সেই জুতা বাদ দিন
সাধারণ ফোস্কা থেকেও মারাত্মক সংক্রমণ ও পচন দেখা দিতে পারে। সাবধান।
হোঁচট খেয়ে পায়ের নখ পড়ে গেলে কী করব
নখ পড়ে গেলেও সাধারণত ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে নতুন নখ গজায়।
- জায়গাটি শুকনো রাখুন এবং নতুন নখ না ওঠা পর্যন্ত শুকনো ব্যান্ডেজে ঢেকে রাখুন
- কখনো খালি পায়ে হাঁটবেন না
- এমন মাপের জুতা বা চপ্পল পরুন, যাতে আঙুলে ঘষা না লাগে
- নতুন নখ আগের নখের মতো না-ও হতে পারে
- ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন, নইলে বড় সংক্রমণ ও পচন হতে পারে
পায়ে কড়া (Corn বা Callus) হলে কী করব
ডায়াবেটিস থাকলে নিজে ব্লেড দিয়ে কড়া কাটবেন না। বাজারের কড়া তোলার ওষুধও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করবেন না। কারণ এতে টিস্যু ক্ষয়কারী রাসায়নিক থাকে, যা চামড়া পুড়িয়ে দিতে পারে। ডায়াবেটিসের জন্য ব্যথা টের পাবেন না, কিন্তু চামড়া পুড়ে যাবে, তারপর সংক্রমণ ও পচন।
করতে পারেন: পা মৃদু গরম পানিতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট ভিজিয়ে ব্রাশ দিয়ে ধীরে ঘষুন। ধৈর্য লাগবে, পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে এক থেকে দুই মাস লাগে। তবে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করাই ভালো।
দুই আঙুলের মাঝে কড়া হলে: সামনের দিকে চাপানো জুতা পরলে পাশাপাশি আঙুলের হাড়ে ঘষা লেগে এই কড়া হয়, অনেক সময় খুব ব্যথাও দেয়।
- আগে জুতা বদলান। জুতা নরম হবে এবং সামনের দিকে যথেষ্ট জায়গা থাকবে
- প্রতিদিন নিজে পা পরীক্ষা করুন, আঙুলের ফাঁক ভালো করে দেখুন
- দিনে একবারের বেশি পা ভেজাবেন না, একবার ভিজিয়ে ব্রাশ দিয়ে ঘষতে পারেন
- কাজ না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
পায়ের অনেক ঘা কড়া থেকেই শুরু হয়। তাই আগেভাগেই সচেতন হোন।
হাঁটা, দৌড় বা জগিং শুরু করার নিয়ম
নতুন করে শুরু করার আগে চিকিৎসকের কাছে পা পরীক্ষা করান। দেখা হবে:
- পা স্বাভাবিক আকারের কি না, কোনো বিকৃতি আছে কি না
- কোথাও অনুভূতি নষ্ট হয়েছে কি না
- রক্ত চলাচল স্বাভাবিক আছে কি না (ডায়াবেটিসে রক্ত চলাচল কমে)
অন্যান্য পরামর্শ
- পরিষ্কার, শুকনো, নরম মোজা পরুন (ডায়াবেটিসের জন্য বিশেষ মোজা পাওয়া যায়)
- ভালো মানের হাঁটা বা দৌড়ের জুতা পরুন
- শরীর টান টান (stretch) ও গরম (warm up) করে নিন
- শেষে শান্ত হয়ে বসে পা দেখুন: কোথাও লাল হয়েছে কি না, ফোস্কার লক্ষণ আছে কি না
- চলার সময় পায়ে ব্যথা লাগলে তখনই থামুন, কোথায় সমস্যা দেখুন
- শুরুর আগে প্রচুর পানি পান করুন
পায়ের অনুভূতি নষ্ট হয়ে গেলে
- দাঁড়িয়ে করা ব্যায়াম (Weight bearing exercise) কমান
- বারবার সিঁড়ি ওঠানামা কমান
- গরম জায়গার ওপর হাঁটা বা দৌড়ানো যাবে না
- পায়ে আগে থেকে ঘা থাকলে দাঁড়িয়ে করা ব্যায়াম একদম নয়
- পায়ে রক্ত চলাচল বাড়ানোর কিছু ব্যায়াম আছে, চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। ডায়াবেটিসে পায়ের যে কোনো আঘাত বা পরিবর্তনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ডায়াবেটিসের রোগীদের বারবার পা ধোয়া কি ভালো?
না, বারবার পা ধুলে চামড়ার স্বাভাবিক তেল চলে গিয়ে চামড়া শুকিয়ে ফেটে যায় এবং মারাত্মক ঘা হতে পারে। দিনে একবার মৃদু গরম পানি ও গোসলের সাবান দিয়ে পা ধুয়ে বিশেষ করে আঙুলের ফাঁক ভালো করে শুকিয়ে নেওয়াই স্বাস্থ্যসম্মত।
ডায়াবেটিস থাকলে পায়ে কড়া হলে কী করা উচিত?
ডায়াবেটিস থাকলে কখনোই নিজে ব্লেড দিয়ে কড়া কাটা বা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বাজারের কড়া তোলার ওষুধ ব্যবহার করা যাবে না, কারণ এতে চামড়া পুড়ে সংক্রমণ ও পচন হতে পারে। পা মৃদু গরম পানিতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট ভিজিয়ে ব্রাশ দিয়ে ধীরে ঘষা যায় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
ডায়াবেটিস রোগীরা কি ঘরের কার্পেটে খালি পায়ে হাঁটতে পারবেন?
না, ঘরের কার্পেটেও খালি পায়ে হাঁটা যাবে না, কারণ সেখানে আলপিন, ছোট পেরেক বা মাছের কাঁটা লুকিয়ে থাকতে পারে। শুধু রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় ছাড়া ঘরে সবসময় চপ্পল পরে থাকতে হবে।
এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।