ডায়াবেটিস মানেই খাবারে কড়াকড়ি, এমন নয়। বরং কোন খাবার রক্তে চিনি ধীরে বাড়ায় আর কোনটি হুট করে বাড়িয়ে দেয়, এই পার্থক্যটা জানলেই অনেক কিছু সহজ হয়ে যায়।
ভালো চিনি, মানে কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের খাবার
গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (Glycaemic Index) হলো একটি মাপকাঠি, যা বলে কোনো খাবারের চিনি কত দ্রুত রক্তে মেশে। যেসব খাবারের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম, সেগুলোর চিনি খাদ্যনালী থেকে ধীরে ধীরে রক্তে আসে। ফলে রক্তের সুগার আস্তে আস্তে বাড়ে। ডায়াবেটিসের দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা এড়াতে এটি খুবই উপকারী। তাই ডায়াবেটিসে এই ধরনের খাবারই খেতে বলা হয়।
ভালো খাবারের তালিকা
- শস্য: লাল বা বাদামি চাল, ঢেঁকিছাঁটা চাল, কুঁড়াসহ চাল, ভুসিসহ লাল আটা, ওটমিল, কুইনোয়া
- কন্দ: মিষ্টি আলু
- ফল: পেয়ারা, আপেল, কমলা, জাম, সব ধরনের বেরি, নাশপাতি, পিচ
- সবজি: মটরশুঁটি, গাজর, টমেটো, সব ধরনের সবুজ ও লাল শাক, বাঁধাকপি, ফুলকপি, লেটুস, পুঁইশাক, ঢেঁড়স, সিম, বরবটি, কাঁচা মরিচ, ব্রকোলি
- ডাল ও বীজ: সিমজাতীয় খাবার, মসুর ডাল
আঁশ কেন এত জরুরি
খাবারের আঁশ এমন এক ধরনের তন্তু, যা খাদ্যনালীতে হজম হয় না, মলের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। কিন্তু যাওয়ার পথে নানাভাবে উপকার করে:
- খাবারের স্বাভাবিক চলাচল ঠিক রাখে, কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়
- খাদ্যনালীর স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং ক্যান্সারের সম্ভাবনা কমায়
- চিনি শোষণ ধীর করে, ফলে রক্তে সুগার ধীরে বাড়ে
- রক্তের খারাপ কোলেস্টেরল কমায়, যা উচ্চ রক্তচাপের রোগীর জন্যও ভালো
- শরীরের প্রদাহ কমায়
- ওজন বাড়তে দেয় না
- সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনে সাহায্য করে
বেশি আঁশযুক্ত সবজি: সব ধরনের সবুজ ও রঙিন সবজি, ঢেঁড়স, ডাটা, পুঁইশাকসহ সবুজ ও লাল শাক, লেটুস, গাজর, মটরশুঁটি, সিম, বরবটি, বাঁধাকপি, ফুলকপি।
খারাপ চিনি, মানে বেশি গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের খাবার
এই খাবারগুলোর চিনি দ্রুত রক্তে মেশে, তাই ডায়াবেটিসের রোগীর এগুলো বাদ দেওয়া জরুরি:
- চিনি, গুড়, মধু
- সাদা চাল (কুঁড়া ছাড়া)
- সাদা রুটি ও ময়দা
- আলু
- মিষ্টি বিস্কুট ও বেকারির অন্যান্য খাবার, পেস্ট্রি, কেক
- কৌটার ফলের রস
- কোমল পানীয়
- তরমুজ
আমিষ ও স্নেহজাতীয় খাবারও দরকার
স্নেহ বা চর্বি কেন লাগে? তেল বা চর্বিজাতীয় খাবার খাদ্যনালী থেকে রক্তে শর্করা যাওয়া বিলম্বিত করে, ফলে সুগার ধীরে বাড়ে। এছাড়া চর্বি পেট ভরা রাখার অনুভূতি দেয়, ফলে অতিরিক্ত খাওয়া ও মিষ্টির লোভ কমে। তবে প্রাণীজ চর্বি যতটা সম্ভব কমিয়ে উদ্ভিজ্জ চর্বি বাড়াতে হবে।
উদ্ভিজ্জ চর্বির ভালো উৎস: অলিভ অয়েল, সানফ্লাওয়ার অয়েল, সয়াবিন তেল (এই ক্রমে ভালো), সব ধরনের বাদাম, বিভিন্ন বীজ এবং অ্যাভোকাডো (দামি, কিন্তু নিরাপদ)।
আমিষ কেন লাগে? আমিষ শরীরের শক্তি তৈরিকে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় রাখতে সাহায্য করে এবং শর্করার চাহিদা কমায়। এতে রক্তের সুগার স্থির থাকে, চিনির লোভ কমে, পেট ভরা লাগে আর খিদে কম পায়। ডায়াবেটিসের রোগীর খাবারের জন্য আকুলিবিকুলি কমে।
প্রাণীজ আমিষ যতটা সম্ভব কমিয়ে সবজি থেকে আমিষ নেওয়া ভালো।
আমিষসমৃদ্ধ সবজি ও খাবার: সিম ও অন্যান্য বীজ, মসুর ডালসহ সব ডাল, সবুজ ও রঙিন শাকসবজি, মটরশুঁটি, সামুদ্রিক সবজি, সয়াজাত খাবার, অঙ্কুরিত ছোলা, সব ধরনের বাদাম, ফুলকপি ও বাঁধাকপি।
অল্প পরিমাণে খেতে পারেন চামড়া ছাড়া মুরগির মাংস ও সামুদ্রিক মাছ।
ডায়াবেটিসের সুপারফুড
এগুলো নিয়মিত খেতে পারলে খুবই উপকার:
- মসুর ডাল
- দারুচিনি
- চিয়া সিড
- স্যামন মাছ
- হোয়াইট বালসামিক ভিনেগার
প্রত্যেক মানুষ আলাদা, তাই খাবারের তালিকাও সবার জন্য এক হবে না। কোন খাবার আপনার জন্য কতটা উপযুক্ত, তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ডায়াবেটিসে ভালো চিনি বা কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের খাবার কোনগুলো?
যেসব খাবারের চিনি খাদ্যনালী থেকে ধীরে ধীরে রক্তে মেশে সেগুলোই কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের ভালো খাবার। এর মধ্যে রয়েছে লাল বা ঢেঁকিছাঁটা চাল, ভুসিসহ লাল আটা, ওটমিল, মিষ্টি আলু, পেয়ারা, আপেল, জাম, মসুর ডাল এবং সবুজ ও রঙিন শাকসবজি।
ডায়াবেটিসের রোগীদের কোন খাবারগুলো এড়িয়ে চলা জরুরি?
চিনি, গুড়, মধু, সাদা চাল, সাদা রুটি ও ময়দা এবং আলু রক্তে দ্রুত চিনি বাড়ায় বলে এড়িয়ে চলা জরুরি। এছাড়া মিষ্টি বিস্কুট, কেক, পেস্ট্রি, কৌটার ফলের রস, কোমল পানীয় এবং তরমুজও বাদ দেওয়া উচিত।
ডায়াবেটিস রোগীর খাবারে আঁশ থাকা কেন জরুরি?
খাবারের আঁশ চিনি শোষণ ধীর করে দেয়, ফলে রক্তে সুগার ধীরে বাড়ে এবং ওজন ও খারাপ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে থাকে। পাশাপাশি এটি কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়, শরীরের প্রদাহ হ্রাস করে এবং খাদ্যনালীর স্বাস্থ্য ভালো রাখে।
এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।