ঘাড়ের ব্যথা খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। ভুল নিয়মে চেয়ার টেবিল ব্যবহার, ভুলভাবে টেলিভিশন দেখা বা কম্পিউটার চালানো, এমনকি ঠিক বিছানা বা ঠিক মাপের বালিশ ব্যবহার না করাও এর কারণ হতে পারে। তবে কখনো কখনো ঘাড়ের ব্যথা কোনো বড় রোগের লক্ষণ হিসেবেও আসে। তাই একে অবহেলা না করে খেয়াল রাখুন, ব্যথাটা বাড়ছে, কমছে, না একই রকম আছে।
ব্যথার কারণ
- কাঁধে ভারী বোঝা বহন বা ঘাড়ে আঘাত
- ঘাড়ের মাংসপেশির খিঁচুনি
- পড়াশোনার সময় সঠিক মাপের চেয়ার টেবিল ব্যবহার না করা
- অতিরিক্ত মানসিক চাপ
- ভুলভাবে কম্পিউটার ও মনিটর ব্যবহার
- উচ্চ রক্তচাপ ও অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস
- বিছানায় ভুলভাবে শোয়া
- মেরুদণ্ডের নানা ধরনের প্রদাহ
- উপুড় হয়ে শোয়া
- মাথার নিচে বেশি বালিশ নিয়ে ঘুমানো
- ঘাড়ের কোনো স্নায়ুতে চাপ
- মেরুদণ্ডের হাড় বা স্নায়ুতে টিউমার
- ফাইব্রোমায়ালজিয়া
লক্ষণ
- চেয়ার টেবিলে একটু বেশি সময় পড়লে বা কম্পিউটারে কাজ করলে ব্যথা বাড়ে
- ব্যথা ঘাড় থেকে কাঁধ ও হাত পর্যন্ত ছড়াতে পারে
- ঘাড় নাড়াতে গেলে মাংসপেশি শক্ত লাগে
- ঘাড় পুরোপুরি ঘোরানো যায় না, ঘোরাতে গেলে কষ্ট হয়
- ঘাড়ের ব্যথার সঙ্গে মাথা ও হাতের আঙুলে ব্যথা
- হাত পা দুর্বল বা অবশ লাগা, শিরশির করা, কাঁটা কাঁটা লাগা
- হাত মুঠো করা বা কিছু তুলতে কষ্ট
- ঘাড়ব্যথার সঙ্গে মাথাব্যথা
সাধারণ ব্যথা প্রতিরোধের নিয়ম
বেশিরভাগ ঘাড়ব্যথার কারণ হলো ঠিকভাবে না শোয়া কিংবা চেয়ার টেবিলে বসার নিয়ম না মানা। কিছু সহজ নিয়ম মানলেই ব্যথা ঠেকানো যায় বা আপনা আপনি ভালো হয়ে যায়।
ঘুমানোর নিয়ম
- বিছানার তোষক বা জাজিম হবে দৃঢ়। নরম গদি এড়িয়ে চলুন
- কখনো উপুড় হয়ে ঘুমাবেন না। বাঁ বা ডান যে কোনো কাতে ঘুমান
- মাথার নিচে একটি পাতলা, নরম বালিশ রাখুন। বালিশ এত বড় হবে যেন মাথা, ঘাড় ও কাঁধ বালিশের ওপর থাকে
বসার নিয়ম
- বসার সময় কাঁধ ও নিতম্ব মাটির সমান্তরাল থাকবে। কান থাকবে সরাসরি কাঁধের ওপরে, সামনে বা পেছনে নয়
- বেশিক্ষণ একই ভঙ্গিতে থাকবেন না। প্রতি ঘণ্টায় একবার ভঙ্গি বদলান ও মাংসপেশি টান টান করুন (স্ট্রেচিং)
- অনেকক্ষণ কম্পিউটারে কাজ করলে মনিটর থাকবে চোখের সমান্তরালে। চোখের লেভেলের নিচে কখনোই নয়, একটু ওপরে থাকলে সমস্যা নেই
- বিছানায় বসে পড়াশোনার অভ্যাস ছাড়ুন
আদর্শ চেয়ার টেবিলের মাপ (উচ্চতার তারতম্যে একটু বদলাবে, চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন)
- টেবিলের উচ্চতা ৭২ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার
- চেয়ারের বসার জায়গার উচ্চতা ৩৮ থেকে ৫৫ সেন্টিমিটার
- শরীর টেবিলের সঙ্গে লম্বভাবে থাকবে
- মনিটর থেকে চোখের দূরত্ব ৪০ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার
- পড়ার জন্য ডেস্ক খুব স্বাস্থ্যসম্মত। ডেস্ক মাটির সঙ্গে ৪৫ ডিগ্রি কোণে হবে
- টেলিভিশনের স্ক্রিন চোখের সমান্তরালে বা একটু ওপরে হবে, কোনোভাবেই নিচে নয়
- হাঁটু দুটি নিতম্বের জয়েন্টের একটু নিচে থাকবে
- হাতলওয়ালা চেয়ার ভালো
- চেয়ারের হেলান দেওয়ার জায়গায় মেরুদণ্ডের বক্রতা অনুযায়ী সমন্বয়ের ব্যবস্থা থাকবে
- চেয়ারের কুশন দৃঢ় হবে, খুব নরম নয়
চলাফেরায়
- হাঁটার সময় মাথা নিচু করে হাঁটবেন না। চোখের দৃষ্টি যতটা সম্ভব মাটির সমান্তরালে রাখুন
- কাঁধ দিয়ে মোবাইল ফোন কানের সঙ্গে চেপে ধরার অভ্যাস ছাড়ুন
- কাঁধে ভারী ব্যাগ বা ওজন বহন করবেন না। মাথায় ওজন বহনও নয়
- ধূমপান ছাড়ুন
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
সাধারণ ঘাড়ব্যথা কয়েক দিনে এমনিতেই সেরে যায়। তবে:
- ব্যথার ওষুধ, ঠান্ডা বা গরম সেঁক এবং মালিশেও না কমলে
- সাধারণ চিকিৎসার পরও বাড়তে থাকলে
- ব্যথা হাতে বা পায়ে ছড়িয়ে গেলে
- ঘাড়ের ব্যথার সঙ্গে মাথাব্যথা বা বমি হলে
- ঘাড়ের ব্যথার সঙ্গে হাত বা পা দুর্বল, অবশ বা কাঁটা কাঁটা লাগলে
- বাইরে আঘাতের চিহ্ন না থাকলেও গাড়ি বা বাইক দুর্ঘটনার পর ঘাড়ে প্রচণ্ড ব্যথা হলে
- উঁচু থেকে পড়ে যাওয়ার পরপরই ঘাড়ে ব্যথা হলে
সতর্কতা: ঘাড়ব্যথার সঙ্গে হঠাৎ হাত বা পায়ের জোর কমে যাওয়া, ধীরে ধীরে অবশ হয়ে আসা, শরীরের কোথাও অনুভূতি নষ্ট হওয়া বা কাঁটা কাঁটা লাগলে সময় নষ্ট না করে অতি দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
প্রশ্ন ও উত্তর
সকালে ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ ঘাড় শক্ত আর ব্যথা। কী করব?
- সাধারণ ব্যথার ওষুধ খান
- ঘাড় স্থির রাখবেন না। আস্তে আস্তে সামনে পেছনে নাড়ান। সামনে পেছনে নাড়াতে পারলে এরপর কাঁধের দিকে ঘাড় নোয়ান
- ঘাড়ে গরম বা ঠান্ডা সেঁক দিন (দুই পাশেই)
- ঘুমানোর জন্য পাতলা ও দৃঢ় বালিশ নিন, নরম নয়
- ভ্রমণে ঝাঁকুনির রাস্তা এড়ান। ঝাঁকুনি এড়ানো না গেলে দৃঢ় ঘাড়ের কলার পরুন
- ঘাড়ের নিচে একটি লন টেনিস বল রেখে ঘাড়কে বলের ওপর বিভিন্ন দিকে নাড়ান। এটি মালিশের কাজ করে, রক্ত চলাচল বাড়ায় ও ব্যথা কমায়
- ছয় থেকে সাত দিনেও না কমলে ডাক্তার দেখান
মানসিক চাপে কি ঘাড়ব্যথা হয়?
হ্যাঁ। অতিরিক্ত মানসিক চাপ ঘাড়ের মাংসপেশিকে টানটান করে দেয়, তাতে ব্যথা হয়। পরে মাংসপেশি নেতিয়ে পড়ে এবং ক্লান্তি আসে।
ঘাড়ব্যথা সাধারণত কতদিন থাকে?
মাংসপেশির সাধারণ খিঁচুনির ব্যথা আপনা আপনি সেরে যায়। দুই সপ্তাহের মধ্যে কিছুটা কমে আর চার থেকে ছয় সপ্তাহে ভালো হয়ে যায়।
শুধু মাংসপেশি টেনে যাওয়ার (Muscle Strain) ব্যথা কি না, বুঝব কীভাবে?
- ব্যথা হঠাৎ শুরু হয়
- ঘাড় একটু নাড়াতেই প্রচণ্ড ব্যথা
- ঘাড় শক্ত হয়ে থাকে
- ব্যথা শুধু ঘাড়েই সীমাবদ্ধ
- থেমে থেমে প্রচণ্ড ব্যথা
এমন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ঘাড়ের মাংসপেশি টান টান (স্ট্রেচিং) করব কীভাবে? এটি খুবই ভালো ব্যায়াম।
- থুতনি দিয়ে বুক ছুঁতে চেষ্টা করুন
- থুতনি যতটা সম্ভব উঁচু করে ঘরের ছাদ দেখুন
- কান দিয়ে কাঁধ ছোঁয়ার চেষ্টা করুন, ডান ও বাম দুই পাশেই
ভালোভাবে শিখে নিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ঘাড়ব্যথার সঙ্গে মাথাব্যথা হতে পারে?
হ্যাঁ। ঠিক বালিশ ও ঠিক বিছানা ব্যবহার না করলে মাথায় রক্ত চলাচল কমে গিয়ে মাথাব্যথা হতে পারে। বালিশ ঠিক মাপের ও ঠিক গঠনের হতে হবে, খুব শক্ত বা খুব নরম নয়।
গরম সেঁক কি উপকারী?
হ্যাঁ। গরম সেঁক মাংসপেশি শিথিল করে, রক্ত চলাচল বাড়ায়। ঘাড়ের টানটান শক্ত মাংসের জন্য খুবই ভালো। অনেক সময় ঘাড়ের সঙ্গে কাঁধেও ব্যথা থাকে, সেঁকে দুটোই কমে।
কোন বালিশ সবচেয়ে ভালো?
বাজারে নানা ধরনের বালিশ আছে। আপনার জন্য কোনটা ঠিক, তা চিকিৎসকের পরামর্শে বেছে নিন।
ঘাড়ের স্নায়ুতে চাপ থাকলে কী কী লক্ষণ দেখা যায়?
ঘাড়, মাথা, মুখমণ্ডল ও কাঁধে ব্যথা। বাহু ও হাতে অবশ ভাব, কাঁটা কাঁটা অনুভূতি, অনুভূতি নষ্ট হওয়া, বাহুর শক্তি কমে যাওয়া। এসব দেখা গেলে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
স্নায়ুতে চাপের ব্যথা কি আপনা আপনি ভালো হয়?
হ্যাঁ, হতে পারে, তবে চার থেকে ছয় সপ্তাহ লাগবে। এ সময়ে:
- পূর্ণ বিশ্রাম নিন, ঘুম বাড়ান
- গরম বা ঠান্ডা সেঁক, মালিশ ও সাধারণ ব্যথার ওষুধ নিন
- স্ট্রেচিং ব্যায়াম করুন
- চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে যোগব্যায়াম শুরু করতে পারেন
- রিকশা বা গাড়িতে চলার সময় ঘাড় বিশ্রামে রাখতে কলার পরুন
- ব্যথার কারণে কাজের ধরন বদলাতে পারেন
- ঠিকভাবে বিছানায় শুয়ুন
হঠাৎ ঘাড় শক্ত হয়ে যায় কেন?
ঘাড়ে আঘাত, ঘাড় মচকানো, এলোমেলো ও জবুথবু হয়ে ঘুমানো। শক্ত হওয়ার সঙ্গে জ্বর থাকলে গুরুতর রোগ হতে পারে, অতি দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
ঘাড় মচকে গেলে কী কী লক্ষণ হয়?
ঘাড়ে প্রচণ্ড ব্যথা, নাড়ালে ব্যথা বাড়ে, হাত পায়ে দুর্বলতা, কাঁটা কাঁটা বা অবশ ভাব। এমন দেখা গেলে অতি দ্রুত ডাক্তার দেখান।
ঘাড়ব্যথা কি বারবার হতে পারে?
হ্যাঁ। মাংসপেশির খিঁচুনির ব্যথা নিয়ম না মানলে বারবার হতে পারে। ধৈর্য ধরে নিয়ম মেনে ও ব্যায়াম করে ভালো হওয়া যায়।
ঘুমের নিয়ম না মেনে যে ঘাড়ব্যথা হয়, তার প্রতিকার কী?
- ঘাড়কে বিশ্রাম দিন
- গাড়িতে ভ্রমণের সময় ঘাড়ের কলার ব্যবহার করুন (বাজারে কিনতে পাওয়া যায়)
- সঠিক বালিশ ব্যবহার করুন
- ব্যথার শুরুতে ঠান্ডা সেঁক বা বরফ, পরে গরম সেঁক
- ঘাড়ে মালিশ
- স্ট্রেচিং ব্যায়াম, চিকিৎসকের কাছ থেকে শিখে নিয়ে
- ঘুমের সঠিক অবস্থান মেনে চলুন
- চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
ঘাড়ব্যথা ঠেকাতে কেমন বালিশ ব্যবহার করব?
শক্ত ও উঁচু বালিশ এড়িয়ে চলুন। একাধিক বালিশ ব্যবহার বন্ধ করুন। বালিশ হবে দৃঢ় ও পাতলা, খুব নরম নয়। এক বালিশই ব্যবহার করুন।
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। ওপরের কোনো সতর্ক লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ঘাড়ব্যথা প্রতিরোধে ঘুমানোর সময় কেমন বিছানা ও বালিশ ব্যবহার করা উচিত?
নরম গদি এড়িয়ে দৃঢ় তোষক বা জাজিমে ডান বা বাম কাতে ঘুমানো উচিত এবং কখনো উপুড় হয়ে শোয়া যাবে না। একাধিক বা উঁচু বালিশ বাদ দিয়ে মাথার নিচে একটি পাতলা ও দৃঢ় বালিশ ব্যবহার করতে হবে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ ঘাড় শক্ত হয়ে ব্যথা হলে কী করবেন?
ঘাড় একদম স্থির না রেখে আস্তে আস্তে সামনে-পেছনে ও কাঁধের দিকে নাড়ান এবং দুই পাশে গরম বা ঠান্ডা সেঁক দিন। প্রয়োজনে সাধারণ ব্যথার ওষুধ খেতে পারেন, তবে ছয় থেকে সাত দিনেও ব্যথা না কমলে ডাক্তার দেখাতে হবে।
ঘাড়ের ব্যথায় কখন দেরি না করে জরুরিভাবে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?
ঘাড়ব্যথার সঙ্গে হঠাৎ হাত বা পায়ের জোর কমে গেলে, অবশ হয়ে এলে বা শরীরের কোথাও কাঁটা কাঁটা লাগলে অতি দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। এছাড়া ব্যথার সঙ্গে জ্বর, মাথাব্যথা, বমি বা দুর্ঘটনার ইতিহাস থাকলেও দ্রুত ডাক্তার দেখানো জরুরি।
এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।