কোমর, নিতম্ব ও মেরুদণ্ডের ব্যথা অনেকটা সর্দিকাশির মতোই। জীবনে একবারও সর্দি হয়নি, এমন মানুষ যেমন বিরল, তেমনি জীবনে একবারও কোমরের ব্যথা হয়নি, এমন মানুষও খুঁজে পাওয়া কঠিন। বেশিরভাগ সময় আপাতদৃষ্টিতে কোনো কারণ ছাড়াই ব্যথা শুরু হয়। অনেক পরীক্ষা করেও সুনির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায় না। সুখবর হলো, এই ব্যথা প্রায়ই আপনা আপনি ভালো হয়ে যায় এবং বড় কোনো চিকিৎসার দরকার হয় না।
লক্ষণ
- কোমর, নিতম্ব ও পিঠের মাংসপেশিতে ব্যথা
- অনেক কষ্টকর ব্যথা, কখনো মনে হয় ছুরির ফলা বিঁধছে
- ব্যথা উরুর পেছন দিয়ে পায়ের দিকে নামে, এমনকি পায়ের তলা পর্যন্ত যেতে পারে
- ব্যথা বাড়ে: কাশি বা হাঁচি দিলে, সামনে ঝুঁকলে, একদম সোজা হয়ে দাঁড়ালে বা হাঁটলে
- অন্য জয়েন্টে সমস্যা না থাকলে হাঁটু মুড়ে বসা যায়
- শরীর পেছনের দিকে বাঁকালে অনেক সময় ব্যথা কমে
- ব্যথার সঙ্গে পায়ের কিছু জায়গার অনুভূতি নষ্ট হতে পারে
জরুরি: ব্যথার সঙ্গে প্রস্রাব বা পায়খানার নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের কাছে যান।
সাধারণ কারণ
- বয়সের কারণে মেরুদণ্ডের হাড় ক্ষয় হওয়া
- হঠাৎ ভারী জিনিস তোলা, যাতে মাংসপেশি খিঁচে যায়
- উঁচু থেকে পড়ে গিয়ে মেরুদণ্ডে আঘাত
- মাংসপেশি বা লিগামেন্ট আংশিক বা পুরোপুরি ছিঁড়ে যাওয়া
- মেরুদণ্ডের জয়েন্টে প্রদাহ বা হাড়ের ইনফেকশন
- মেরুদণ্ডের দুই হাড়ের মাঝের টিস্যু বেরিয়ে এসে স্নায়ুতে চাপ দেওয়া
- জন্মগত বা আঘাতজনিত কারণে বাঁকা মেরুদণ্ড
- মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যাওয়া। অস্টিওপোরোসিসে কোনো আঘাত ছাড়াই ভাঙতে পারে
- মেরুদণ্ডের কিছু টিউমার
- অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
বেশিরভাগ ব্যথা বিশ্রাম ও সাধারণ ব্যথার ওষুধে এক থেকে দুই সপ্তাহে সেরে যায়। তবে এই অবস্থায় ডাক্তার দেখান:
- ঘরের চিকিৎসায় দুই সপ্তাহেও ব্যথা না কমলে, বরং বাড়তে থাকলে
- ব্যথার সঙ্গে প্রস্রাব বা পায়খানার সমস্যা হলে
- ব্যথার সঙ্গে জ্বর থাকলে
- উঁচু থেকে পড়ে বা অন্য আঘাতে মেরুদণ্ডে ব্যথা হলে
- ব্যথা হাঁটুর নিচ পর্যন্ত নামলে
- পায়ে দুর্বলতা, অবশ ভাব বা টনটনে ব্যথা থাকলে
- কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমতে থাকলে
- ৫০ বছরের পর হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়া পিঠ বা নিতম্বে ব্যথা শুরু হলে
ব্যথার ঝুঁকি বাড়ায় যা
- ৩০ বা ৪০ বছরের পর বয়স যত বাড়ে
- দুর্বল মাংসপেশি, শারীরিক পরিশ্রম না করা
- বাড়তি ওজন
- ভারী জিনিস তোলার সঠিক নিয়ম না মেনে বারবার তোলা
- সবসময় কাঁধে ভারী ব্যাগ বহন
- দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতা
- ধূমপান
- অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ
প্রতিরোধ: মেরুদণ্ডের মাংসপেশি শক্ত রাখুন
মাংসপেশি দুর্বল থাকলে ব্যথার সম্ভাবনা বাড়ে, তাই আমাদের মূল লক্ষ্য মেরুদণ্ডের মাংসপেশি দৃঢ় রাখা।
- নিয়মিত হাঁটুন। সাঁতার খুব ভালো ব্যায়াম
- পেট ও পিঠের মাংসপেশির ব্যায়াম করুন, চিকিৎসকের পরামর্শে
- ওজন স্বাভাবিকের বেশি হতে দেবেন না
- ধূমপান ছাড়ুন
- ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
- কিছুক্ষণ পরপর কোমর ও পিঠ মোচড়ানো মেরুদণ্ডের জন্য ক্ষতিকর, এ অভ্যাস ছাড়ুন
- যাঁরা বেশিক্ষণ বসে কাজ করেন, ঘাড়, পিঠ ও কোমর টান টান (স্ট্রেচিং) করার ব্যায়াম করুন, চিকিৎসকের কাছ থেকে শিখে নিন
- অকারণে ডানে বা বাঁয়ে হেলে দাঁড়াবেন না
- অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করলে, যেমন বক্তৃতা দেওয়া বা রান্না, পালা করে একটি পা নিচু টুলে রাখুন
বসার সঠিক নিয়ম
- দৃঢ় চেয়ার ব্যবহার করুন, নরম নয়। বসার জায়গা মাটির সমান্তরাল হবে, যাতে নিতম্ব ও কাঁধ সমান্তরালে থাকে
- পা পাদানিতে (ফুটরেস্টে) রাখতে পারলে ভালো
- চেয়ারে কোমরের পেছনে সাপোর্ট থাকবে
- বসার পর নিতম্ব ও হাঁটু একই সমতলে থাকবে
ভারী জিনিস তোলার সঠিক নিয়ম
সম্ভব হলে ভারী জিনিস তোলা এড়িয়ে চলুন। তিন কেজির বেশি ভারী জিনিস তোলা বিশেষভাবে এড়িয়ে চলুন। একান্তই তুলতে হলে:
- জিনিসটা শরীরের যতটা সম্ভব কাছে রাখুন
- মেরুদণ্ড সোজা রাখুন
- হাঁটু বাঁকিয়ে নিচু হোন
- কোমর বা মেরুদণ্ড মোচড়াবেন না
- দরকার হলে কারও সাহায্য নিন
ডাক্তার দেখানোর আগে ঘরে যা করবেন
শোয়ার সঠিক নিয়ম
- এক তোষকের দৃঢ় বিছানায় শুয়ুন। কাঠের মতো শক্ত নয়
- চিত হয়ে হাত পা ছড়িয়ে বা উপুড় হয়ে শোবেন না
- ডান বা বাঁ কাতে শুয়ুন
- মাথার নিচে পাতলা বালিশ নিন
- হাঁটু একটু ভাঁজ করে রাখুন, পা টান টান করে লম্বা করবেন না
- কাত হয়ে শুয়ে দুই হাঁটুর মাঝখানে একটি বালিশ বা কোলবালিশ রাখলে ভালো ফল মেলে
- বিছানা থেকে ওঠার সময় যে কোনো পাশে ফিরে উঠুন। চিত অবস্থা থেকে কখনো সরাসরি উঠবেন না
আরও কিছু উপদেশ
- হিটিং প্যাড ব্যবহার করুন
- গরম পানিতে গোসল করুন
- সাধারণ ব্যথার ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শমতো খেতে পারেন
প্রশ্ন ও উত্তর
ব্যথা নিয়ে হাঁটাহাঁটি করা যাবে?
হ্যাঁ, যাবে। তবে হাঁটলেই যে সবসময় ব্যথা কমবে, তা নয়। হেঁটে দেখুন। ব্যথা বাড়লে নিয়ম মেনে কয়েক দিন শুয়ে বিশ্রাম নিন।
গরম সেঁক দেব?
চিকিৎসকের পরামর্শে হিটিং প্যাড ব্যবহার করতে পারেন। সাময়িক আরাম মিলতে পারে। গরম পানিতে গোসলে অনেক সময় আরাম লাগে। সুইমিং পুলের গরম পানিতে সাঁতার খুব উপকারী। পিঠের মাংসপেশির খিঁচুনির ব্যথা গরম সেঁকে কমে।
ব্যথা কমাতে আর কী করব?
- সচল থাকুন। শুধু বসে বা শুয়ে থাকলে চলবে না
- বসে থাকার চেয়ে শুয়ে থাকা ভালো, তবে শোয়ার নিয়ম মেনে
- ওজন স্বাভাবিক রাখুন
- নিজের ব্যক্তিগত কাজ নিজে করুন এবং কাজের ফাঁকে বিশ্রাম নিন
- বসা ও হাঁটার নিয়ম চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন
- ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
- সঠিক জুতা বা চপ্পল পরুন, এ বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
- চিকিৎসকের পরামর্শে স্ট্রেচিং ব্যায়াম করুন
- চিকিৎসকের পরামর্শে মৃদু গরম সেঁক নিন
হঠাৎ প্রচণ্ড ব্যথার কারণ কী?
- ভারী ওজন তোলা বা হঠাৎ নিচু হওয়ার কারণে পিঠের মাংসপেশির খিঁচুনি
- পিঠের রগ বা মাংসপেশি ছিঁড়ে যাওয়া, আঘাত বা জোর করে ভারী কাজ করার ফলে
- মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যাওয়া, আঘাত, অস্টিওপোরোসিস বা টিউমারের কারণে
- মেরুদণ্ডের সংক্রমণ
- স্নায়ুতে চাপ পড়া
ব্যথার সময় মালিশ করা যাবে?
অনেক সময় উপকার পাওয়া যায়, তবে সঠিক নিয়মে বিছানায় শুয়ে। মালিশে রক্ত চলাচল বাড়ে, মাংসপেশি শিথিল হয় ও ব্যথা কমে।
দিনে ব্যথা কম, রাতে বাড়ে ও ঘুম ভেঙে যায়। কী করব?
অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। অনেক সময় এটি গুরুতর রোগের লক্ষণ।
সকালের দিকে ব্যথা বেশি। কী করব?
সাধারণত শোয়ার নিয়ম না জানা বা ঠিক বিছানা ব্যবহার না করার কারণে এমন হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কখন ব্যথা গুরুতর রোগের লক্ষণ?
ব্যথার সঙ্গে নিচের যে কোনোটি থাকলে, সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:
- পায়ে বা উরুতে দুর্বলতা, বিশেষ করে দিন দিন বাড়তে থাকলে
- শরীরের কোনো অংশে অনুভূতি না থাকা
- প্রস্রাব বা পায়খানার নিয়ন্ত্রণ না থাকা
- প্রায়ই জ্বর থাকা
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। ব্যথা বাড়লে বা ওপরের কোনো সতর্ক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কোমর ব্যথায় কীভাবে শোয়া এবং বিছানা থেকে ওঠা উচিত?
কাঠের মতো শক্ত নয় এমন এক তোষকের দৃঢ় বিছানায় ডান বা বাঁ কাতে হাঁটু একটু ভাঁজ করে শুতে হবে এবং দুই হাঁটুর মাঝখানে একটি বালিশ বা কোলবালিশ রাখলে ভালো ফল মেলে। চিত বা উপুড় হয়ে শোবেন না, আর বিছানা থেকে ওঠার সময় কখনো সরাসরি না উঠে যে কোনো এক পাশে ফিরে উঠুন।
একান্তই ভারী জিনিস তুলতে হলে মেরুদণ্ড বাঁচাতে কী নিয়ম মানবেন?
তিন কেজির বেশি ভারী জিনিস তোলা এড়িয়ে চলাই ভালো, তবে তুলতে হলে মেরুদণ্ড সোজা রেখে হাঁটু বাঁকিয়ে নিচু হোন এবং জিনিসটি শরীরের যতটা সম্ভব কাছে রাখুন। তোলার সময় কোমর বা মেরুদণ্ড মোচড়াবেন না এবং প্রয়োজনে অন্য কারও সাহায্য নিন।
কোমর ব্যথার সঙ্গে কোন লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?
ব্যথার সঙ্গে প্রস্রাব বা পায়খানার নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হলে, পায়ে বা উরুতে দিন দিন দুর্বলতা বাড়লে, শরীরের কোনো অংশের অনুভূতি চলে গেলে কিংবা প্রায়ই জ্বর থাকলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এছাড়া রাতে ব্যথা বেড়ে ঘুম ভেঙে গেলেও অবশ্যই ডাক্তার দেখানো জরুরি।
এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।